মানবসভ্যতায় কোরবানির ঐতিহ্য বনি ইসরাইলের গাভি কোরবানি

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তারা গাভিটি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করল। এর মধ্যে আল্লাহর কুদরতে বনি ইসরাইল বংশে একটি ঘটনা ঘটে গেল। তাতে এই গাভিটি জবাই করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যুবক তার গাভিটি স্বর্ণের দামে বিক্রি করল। এ ছিল মায়ের প্রতি ভক্তি ও খেদমতের কারণে আল্লাহর বিশেষ দান।

ঘটনাটি ছিল, বনি ইসরায়েল বংশে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। তাতে আমিল নামক এক ব্যক্তি নিহত হয়। কিন্তু তার হত্যাকারী অজানা ছিল। আমিলের হত্যাকারীকে এবং তাকে হত্যার কারণ কী তা নিয়ে তাফসিরকারদের মধ্যে মতভেদ আছে।

আতা ও সুদ্দি বলেন, বনি ইসরাইলে এক ব্যক্তি ছিল বিরাট ধনী। তার এক চাচাতো ভাই ছিল খুবই গরিব। তার আর কোনো ওয়ারিশ ছিল না। আমিল তাড়াতাড়ি মরছে না দেখে চাচাতো ভাই তার উত্তরাধিকারী সম্পদ হস্তগত করার লোভে তাকে হত্যা করে।

কোনো কোনো তাফসিরকারের ভাষ্য হলো, আমিল তার এক চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিল। মেয়েটি ছিল পরমা সুন্দরী এবং বনি ইসরাইলের মাঝে তার রূপ ও গুণ উপমায় পরিণত হয়েছিল। ওই নারীকে বিয়ের জন্য আমিলকে তার চাচাতো ভাই হত্যা করে।

কালবি বলেন, আমিলের ভাতিজাই তাকে হত্য করে চাচাতো বোন অর্থাৎ আমিলের মেয়েকে বিয়ের জন্য। তাকে হত্যা করার পর তার লাশ অন্য পাড়ায় নিয়ে যায় এবং গোপনে লাশটি সেখানে ফেলে আসে। বলা হয়েছে যে, দুটি গ্রামের মাঝখানে তার লাশ ফেলে আসা হয়।

ইবনে আব্বাসের আজাদকৃত দাস প্রখ্যাত মুফাসসির ইকরামা ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, বনি ইসরাইলের একটি মসজিদ (উপাসনালয়) ছিল। মসজিদের বারটি দরজা বনি ইসরাইলের বারো গোত্রের জন্য বরাদ্দ ছিল। এক গোত্রের লোকেরা তাদের দরজার সামনে আমিলের লাশ দেখতে পেল। তারা লাশটি টেনে অন্য দরজায় নিয়ে রাখল। এবার শয়তান এসে তাদের মাঝে ঝগড়া লাগিয়ে দিল।

কালবি বলেন, এই ঘটনা ছিল তাওরাতে কাসসামা তথা কিসাস ও দিয়ত এর বিধান নাজিল হওয়ার আগেকার। তারা সবাই একজোট হয়ে মুসা (আ.)-কে বলল, আপনি আল্লাহর কাছে হত্যাকারী কে তা আমাদের কাছে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করার জন্য বলুন। মুসা (আ.) আল্লাহতায়ালার কাছে আরজি পেশ করলেন। আল্লাহ তাদের একটি গাভি ২ জবাইয়ের হুকুম দিলেন। যারা বিবরণ এই আয়াতের মধ্যে বিধৃত। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন মুসা (আ.) তাঁর জাতিকে বলল, আল্লাহতায়ালা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা একটি গাভি জবাই করো। (এ কথা শুনে ) তারা বলল, আপনি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা মশকরা করছেন। (আমরা বললাম নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীর পরিচয় বলার কথা আর আপনি বলছেন গাভি জবাই করার কথা। তাদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথার জবাবে) মুসা (আ.) বললেন, আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই যে, জাহিল লোকদের মতো ঠাট্টা মশকরা করব।’ (সুরা বাকারা : ৬৭)

লোকেরা বুঝতে পারল, গাভী জবাই করার হুকুম আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এরপরও তারা নানা প্যাঁচাল শুরু করল। ‘তারা বলল, আপনি স্বীয় পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন তিনি যেন আমাদের গরুটির রূপ বিশ্লেষণ করে দেন। মুসা বললেন, সেটি হবে একটি গাভি, যা বৃদ্ধ নয়, বাছুরও নয়। (বড়ও নয় ছোটও নয়।) উভয়ের (মাঝখানে, বার্ধক্য ও যৌবনের) মাঝামাঝি বয়সের। সুতরাং (এখন বেশি বাদানুবাদ না করে) যা আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেল।’ (সুরা বাকারা : ৬৮)। ‘তারা বলল, আপনার পালনকর্তার কাছে প্রার্থনা করুন, গরুটির রং কিরূপ হবে তা যেন তিনি বলে দেন। মুসা বললেন, এ সম্পর্কে আল্লাহ বলছেন যে, গাভিটি হবে গাঢ় পীতবর্ণের, দেখলে দর্শকরা আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়বে।’ (সুরা বাকারা : ৬৯)। ‘তারা বলতে লাগল, এবার আমাদের জন্য আরও একটি প্রার্থনা করুন, যাতে গাভিটির আর কি গুণাগুন আছে আরেও স্পষ্ট করে বলে দেন। কারণ গরুর ব্যাপারে আমাদের মনে সাদৃশ্যের সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। (এটা কি চাষাবাদ বা পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এমন হবে, নাকি নয়। ইনশাআল্লাহ আমরা অবশ্যই এবার ঠিক ঠিক বুঝে নেব।’ (সুরা বাকারা : ৭০)

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘তারা যদি ইনশাআল্লাহ না বলত তাহলে গাভির রূপ ও আকৃতি বর্ণনা কোনো দিনও শেষ হতো না এবং আরও জটিলতর হতো। কোরআনে আছে, ‘মুসা (আ) বললেন, আল্লাহতায়ালা বলছেন, গরুটি এমন হবে যে, তাকে হালচাষে জোড়া হয়নি; কিংবা শষ্যক্ষেতে সেচের কাজে খাটানো হয়নি। এক কথায় গরুটি হবে নিখুঁত নিদাগ, সম্পূর্ণ সুস্থ, দোষত্রুটিমুক্ত। তারা বলল, এবারই আপনি সঠিক ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন। অতপর তারা গাভীটি জবেহ করল। অথচ তারা কাজটি করতে রাজি ছিল না।’ (সুরা বাকারা : ৭১)

মুহাম্মদ ইবনে কাব বলেন, উপরোক্ত পরিচয়ের গাভির সন্ধানে তারা লেগে গেল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না। শেষপর্যন্ত সেই মাতৃভক্ত যুবকটির কাছে গিয়ে দেখে তার গাভিটি বর্ণনার সঙ্গে সম্পূূর্ণ মিলে যায়। অতঃপর চামড়া ভর্তি স্বর্র্ণের দামে তা খরিদ করতে বাধ্য হয়।

কাসায়ি গাভীটি কেনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, তারা গাভির খুঁজে মিশাইর কাছে এল। মিশাই তাদের বলল, এই গরু আমি বিক্রি করব না, যদি না আল্লাহর নবী মুসা (আ.) উপস্থিত থাকেন। তারা তাতে রাজি হলো। অতঃপর গাভিটি মুসা (আ.)-এর সামনে নিয়ে গেল। মুসা (আ.) গাভির দাম জিজ্ঞাস করাতে মিশাই বলল, যদিও আপনার আর আমার মাঝে দরদাম বলা উচিত নয়; তবুও আমার কথা হলো, এই গাভির চামড়াভর্তি স্বর্ণ না হলে আমি গাভি বিক্রি করব না। মুসা (আ.) তখন বনি ইসরাইলের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা (্প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে বিষয়টি নিজেদের জন্য জটিল করে ফেলেছ। ফলে আল্লাহতায়ালা ব্যাপারটিকে তোমাদের জন্য জটিল ও কঠিন করে দিয়েছেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে তারা তাই করল। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, যখন তোমরা একজনকে হত্যা করে পরে সে সম্পর্কে একে অপরকে দোষারোপ করছিলে, যা তোমরা গোপন করছিলে তা প্রকাশ করে দেয়াই ছিল আল্লাহর অভিপ্রায়।’ (সুরা বাকারা : ৭২)। ‘অতঃপর আমি নির্দেশ দিলাম গরুটি জবাই করার পর এর একটি টুকরা দ্বারা মৃতকে আঘাত কর। এইভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন। এবং তোমাদের তার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করেন, যাতে তোমরা চিন্তাভাবনা করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ৭৩)

গাভির শরীরের কোন অংশ নিয়ে আঘাত করা হয়, তা নিয়ে তাফসিরকারদের মতামত ভিন্ন ভিন্ন। ইবনে আব্বাস বলেন, গাভির ঘাড়ের তরুণাস্থির সঙ্গে যুক্ত হাড় দিয়ে আঘাত করা হয়। জাহহাক বলেন, গাভির জিহ্বা দিয়ে আঘাত করা হয়। হুসাইন ইবনে ফজলও বলেন, সর্বোত্তম মত হলো জিহ্বা। কেননা, মূল উদ্দেশ্য নিহত ব্যক্তি কথা বলা। কথা বলার অঙ্গই হচ্ছে জিহ্বা। এদিকে আঘাতের পর নিহত ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়ায়। তখনও তার গর্দানের রগ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তিনি বলেন, অমুক ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। এ কথা বলার সাথে সাথে তিনি আবার ওই স্থানে ঢলে পড়েন। আল্লাহতায়ালা চাক্ষুষ দেখিয়ে দেন যে, এভাবেই তিনি কেয়ামতের দিন মৃতদের পুনরায় জীবিত করবেন।

হত্যাকাণ্ডের তথ্য উদ্ঘাটনে গরু কোরবানির এই ঘটনাও প্রমাণ করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ এবং তার কাছ থেকে ফায়সালা জানার অন্যতম মাধ্যম কোরবানি। যুগে যুগে কোরবানির এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে মুসলিম জাতি। আমরা এখন মানব ইতিহাসের আরেকটি কোরবানির ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করব। এর মধ্যেও আমরা ইসলামের সৌন্দর্য, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ অনুধাবন করতে সক্ষম হব।