ইসলামে শরীরচর্চার গুরুত্ব

আবিদ রাইয়ান

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরীর সুস্থ থাকলে ইবাদত-বন্দেগি ও কর্মমুখর জীবন কাটানো সহজ হয়। তাই শরীরচর্চা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে তা প্রশংসনীয়ও। শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও অতীব প্রিয়। অবশ্য প্রত্যেকের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। যাতে তোমার উপকার হবে, তার প্রতি আগ্রহী হও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (মুসলিম : ২৬৬৪)।

ইসলামে শরীরচর্চার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো- দেহকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখা, যেন বান্দা আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করতে পারে। নামাজ, রোজা, হজ, উপার্জনসহ সব ক্ষেত্রেই সুস্থ শরীর অপরিহার্য। অতিরিক্ত অলসতা, স্থূলতা বা শারীরিক দুর্বলতা অনেক সময় ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, যা কখনও কাম্য নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি হাঁটাহাঁটি করতেন, সফর করতেন, ঘোড়ায় চড়তেন, দৌড়াতেন। সাহাবিরাও নবীজির অনুসরণে শরীরচর্চা করতেন। ইসলাম দেহ ও আত্মার মধ্যে ভারসাম্য চায়। আত্মিক ইবাদত যেমন জরুরি, তেমনি শারীরিক সুস্থতাও অপরিহার্য। সঠিক নিয়ত, শালীনতা ও মধ্যপন্থা বজায় রেখে শরীরচর্চা করা একজন মুমিনের জীবনধারার অংশ হওয়া উচিত।

তীর নিক্ষেপ : নবীজি ও সাহাবিদের যুগে জনপ্রিয় খেলাধুলা ছিল তীর নিক্ষেপ। যুদ্ধবিদ্যার পাশাপাশি শরীরচর্চার জন্য সাহাবিরা এই খেলা চর্চা করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) তীর নিক্ষেপকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আল্লাহ একটি তীরের উসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন- তীর নির্মাতা যে নির্মাণকালে কল্যাণের আশা করেছে, এই তীর নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী। তিনি আরও বলেন, তোমরা তীরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শিক্ষা করো। তবে তোমাদের ঘোড়দৌড় শেখার তুলনায় তীরন্দাজি শেখা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়।’ (তিরমিজি : ১৬৩৭)।

ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা : আরবদের ভেতর ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার অভ্যাস ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। এই প্রতিযোগিতা হাফয়া থেকে শুরু হয়ে সানিয়্যাতুল বিদায় শেষ হতো। বর্ণনাকারী বলেন, আমি মুসা (রা.)-কে বললাম, এর দূরত্ব কী পরিমাণ হবে? তিনি বললেন, ছয় বা সাত মাইল। আর প্রশিক্ষণহীন ঘোড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হতো সানিয়্যাতুল বিদা থেকে এবং শেষ হতো বনু জুরাইকের মসজিদে। আমি বললাম, এর মধ্যে দূরত্ব কত? তিনি বললেন, এক মাইল বা তার তদ্রুপ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-ও এই প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (বোখারি: ২৮৭০)।

মল্লযুদ্ধ : ইসলামের শুরুর যুগে একটি প্রসিদ্ধ খেলা ছিল মল্লযুদ্ধ। মহানবী (সা.) নিজেও একবার মল্লযুদ্ধে অংশ নেন। মক্কার একজন বিখ্যাত মল্লযোদ্ধা ছিল রুকানা বিন ইয়াজিদ। একদিন মহানবী (সা.) তাকে দ্বীনের দাওয়াত দিলে সে তা প্রত্যাখ্যান করে।

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, আমি যদি মল্লযুদ্ধে তোমাকে পরাজিত করি, তবে কি তুমি আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে? রুকানা তাতে সম্মত হলো। অতঃপর মহানবী (সা.) তাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম : ১/৩৯০)।

দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা : দ্বীনের দাওয়াত, যুদ্ধের অভিযান ও জীবিকার অনুসন্ধান ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে বের হওয়ার পর দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা হতো। দ্বীনি কাজে বের হয়ে এমন প্রতিযোগিতা করাকে মহানবী (সা.) উৎসাহিত করেছেন।

ভারোত্তোলন : তৎকালীন আরব সমাজে ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতাও ছিল। বলা হয়ে থাকে, সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর মাথায় এই খেলার ধারণা প্রথম আসে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর এমন এক দল মানুষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা পাথর উত্তোলন করছিলেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তাদের কী হয়েছে? একজন বলল, তারা পাথর উত্তোলন করছে এবং দেখছে তাদের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী। তিনি বলেন, আল্লাহর পথের কর্মীরা তাদের চেয়ে শক্তিশালী। (ইরওয়াউল গালিল : ৫/৩৩৩)।