হতাশা থেকে মুক্তির উপায়
ফাহিম মাসরুর
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে চরম অস্থিরতার সময়ে মানুষের অস্তিত্বের একদম গভীরে আঘাত করছে যে বিষয়টি, তা হলো মানসিক বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা। জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও বর্তমান বিশ্বের একটি বড় অংশের মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছে একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সাথে।
একদিকে পৃথিবীর বহু মানুষ যখন দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের মুখোমুখি, তখন সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ও প্রাচুর্যের মধ্যে থাকা মানুষগুলো ভুগছে এক তীব্র মানসিক শূন্যতায়। অগাধ ধন-সম্পদ থাকার পরও কেন এই একাকীত্ব আর হাহাকার? উত্তরটা আসলে আমরা কী পেয়েছি তার মধ্যে নেই, বরং লুকিয়ে আছে আমরা কী হারিয়েছি তার মধ্যে। আর তা হলো আমাদের আত্মিক বা আধ্যাত্মিক আশ্রয়।
ইসলামের মূল কথাই হলো মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের গভীর ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। আর এই আধ্যাত্মিক সংযোগের মাধ্যমেই মানুষের অশান্ত হৃদয় খুঁজে পায় সত্যিকারের আরোগ্য।
আধুনিক যুগের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট
আমরা এখন এমন এক বিভ্রান্তিকর সময়ে বাস করছি, যেখানে সবধরনের বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েও ভাঙা মন কিংবা ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে জোড়া লাগানো যাচ্ছে না। মানব ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন মানসিক চাপ ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা প্রকট রূপ ধারণ করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস যেখানে মানুষকে মানসিক শান্তি ও সান্ত¡না দেওয়ার কথা, সেখানে আধুনিক যুগের মানুষ যেন রবের সাথে সেই সংযোগটাই হারিয়ে ফেলেছে। জীবনের গভীর অর্থ খোঁজার চেয়ে বরং জাগতিক জিনিসপত্র পাওয়ার অন্ধ দৌড় সাময়িক উপশম দিলেও তা ভেতরের অশান্ত আত্মাকে শান্ত করতে পারছে না।
আমাদের চারপাশে এখন হাত বাড়ালেই মেলে বিনোদন ও বিলাসিতার সব উপকরণ, অথচ বাস্তব চিত্র হলো মানুষের মন এখন বড় বেশি একা। গভীর অন্ধকারে বিলাসবহুল আসবাবপত্র এসে কারো হাত ধরে না, আর অত্যাধুনিক কোনো প্রযুক্তি চোখের পানি মুছে দিতে পারে না। ঋণ আর নানামুখী চাহিদার বিশাল ঢেউয়ে পড়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে যায়, তখন অনেকেই ভুল পথে শান্তি খুঁজতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে নানা মরণঘাতী নেশা ও আত্মঘাতী আচরণে। এই অতল গহ্বর থেকে বাঁচতে হলে আমাদের জীবনের অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে সাজাতে হবে এবং বুঝতে হবে যে, আত্মার খোরাক সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসলামের সহজ ও শাশ্বত সমাধান
এই ভারী মানসিক বোঝা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম অত্যন্ত সহজ এক সমাধান দেয়- তা হলো নিজের সৃষ্টিকর্তা বা রবের কাছে ফিরে যাওয়া। মহান আল্লাহ মানুষের মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে ভালো জানেন, কারণ তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা।
মানুষের ভেতরের প্রতিটি ফোঁটা কষ্ট, হতাশা আর দুঃখের খবর তিনি রাখেন। মানুষ যখন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহকে ফিরিয়ে আনে, তখন তার ভেতরের কষ্টগুলো কমতে শুরু করে। কারণ তখন সে অন্ধকারের গোলকধাঁধা থেকে আলোর দিকে যাত্রা শুরু করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই শুধু হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।
ইসলাম শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং এটি জীবনের এমন এক পূর্ণাঙ্গ বিধান যা মানুষকে তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যের সাথে মিলিয়ে দেয়। মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য। আর পরম দয়ালু আল্লাহ এই দুনিয়ার নানামুখী পরীক্ষার মুখোমুখি করার জন্য মানুষকে নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে দেননি। তিনি মানুষকে পথ নির্দেশনা হিসেবে দিয়েছেন পবিত্র কোরআন এবং তা ব্যাখ্যা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা আদর্শ। এটিই হতাশা ও দুশ্চিন্তা মোকাবিলায় ইসলামের প্রধান ভিত্তি, যা এই অস্থির পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখার এক অনন্য হাতিয়ার।
পরীক্ষা ও কষ্টের প্রতি মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি
একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ভুল হলো জীবনের ধর্মীয় দিক এবং জাগতিক দিককে আলাদা করে ফেলা। আমরা যখন পূর্ণ আত্মসমর্পণের সাথে মেনে নিই যে এই পৃথিবীটা আসলে আমাদের জন্য একটা পরীক্ষাগার, তখন জীবনের অর্থ পুরোপুরি বদলে যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে, যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহান প্রতিদান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একজন মুমিনের সব বিষয়ই কল্যাণকর। এটি মানব মস্তিষ্কের জন্য এক বৈপ্লবিক ধারণা। মুমিন বা বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন কোনো সুখের দেখা পায়, তখন সে আল্লাহর শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণকর। আবার যখন সে কোনো কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন সে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে, যা-ও তার জন্য কল্যাণকর।
ইসলাম আমাদের সাময়িক সুখের মোহ থেকে বের হয়ে পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দুনিয়াটা একটা ক্ষণস্থায়ী যাত্রাবিরতি মাত্র, যা কখনো সুখে ভরপুর, আবার কখনো শোকে লীন। মানুষের জীবনের প্রকৃত রূপই এমন।
আত্মিক মুক্তির তিন মূল স্তম্ভ
আধুনিক জীবনের উদ্বেগ ও মানসিক বন্দিদশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ইসলাম তিনটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। এগুলো শুধু মুখের কথা নয়, বরং মানুষের অন্তরকে জীবনের সব ঝড়-ঝাপটা থেকে রক্ষা করার ঢাল।
সবর বা ধৈর্য: ধৈর্যধারণ করে মেনে নেওয়া যে জীবনে পরীক্ষা আসবেই। কোরআনে বলা হয়েছে, আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা; তবে ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।
শুকর বা কৃতজ্ঞতা: নিজের যা আছে, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ বলেন, তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।
তাওয়াক্কুল বা ভরসা: যেকোনো কাজের ফলাফলের জন্য একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা। পবিত্র কোরআনে এসেছে, আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন, তবে তোমাদের ওপর জয়ী হওয়ার কেউ নেই। আর আল্লাহর ওপরই যেন মুমিনরা ভরসা করে।
আত্মার শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান
হতাশা ও দুশ্চিন্তা দূর করার এই ইসলামী উপায়গুলো মূলত আমাদের দৈনন্দিন সংগ্রামকে আত্মিক উন্নতির সুযোগে রূপান্তর করে। আমাদের মনোযোগ যখন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরন্তন পরকালের দিকে ঘুরে যায়, তখন আমরা এমন এক শান্তি খুঁজে পাই যা কোনো ধন-সম্পদ দিতে পারে না। মানুষ তখন বুঝতে পারে যে সে কখনোই একা নয়, তার সৃষ্টিকর্তা তার শাহরগ বা ঘাড়ের রগের চেয়েও বেশি কাছে আছেন।
একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল সময়ে ইসলাম আমাদের মনের শান্তির এক শাশ্বত সমাধান দেয়। ইসলাম আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে শান্ত করার আহ্বান জানায় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। আল্লাহর দেখানো পথেই এই প্রতিকূল পৃথিবীতে টিকে থাকার শক্তি এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে।
দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দোয়া
এমন কিছু আমল রয়েছে যার মাধ্যমে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকা যায়। পবিত্র কোরআনে একটি আয়াত বেশি বেশি পড়ার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। আয়াতটি হলো-
বাংলা উচ্চারণ : ‘হাসবি ইয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা, হুয়া আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুয়া রাব্বুল আরশিল আজিম।’
বাংলা অর্থ : আমার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আমি তাঁর ওপর ভরসা করলাম। আর তিনিই মহান আরশের অধিপতি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা উল্লিখিত আয়াতটি সাতবার পাঠ করবে তাকে সব পেরেশানি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (আবু দাউদ : ৫০৮১)।
আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘একবার রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে আবু উমামাহ নামক এক আনসারি সাহাবিকে দেখতে পেয়ে তাকে বলেন, হে আবু উমামাহ, কী ব্যাপার! আমি তোমাকে নামাজের ওয়াক্ত ছাড়া মসজিদে বসে থাকতে দেখছি? তিনি বলেন, সীমাহীন দুশিন্তা ও ঋণের বোঝার কারণে হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বলেন, আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শিখিয়ে দেব না, তুমি তা বললে আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থাও করে দেবেন? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল। তিনি (সা.) বলেন, তুমি সকাল-সন্ধ্যায় নি¤েœাক্ত দোয়া বলবে।’ দোয়াটি হলো-
বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আজজি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গলাবাতিদ দাইনি ওয়া কহরির রিজাল।
বাংলা অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার কাছে আশ্রয় চাই ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের রোষানল থেকে।
আবু উমামাহ (রা.) বলেন, আমি তাই করলাম। ফলে মহান আল্লাহ আমার দুশ্চিন্তা দূর করলেন এবং আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থাও করে দিলেন।’ (আবু দাউদ : ১৫৫৫)।
