চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ
মোস্তাফা কামাল গাজী
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানে রয়েছে পুরোনো আমলের বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। তারমধ্যে অন্যতম হলো হামিদিয়া তাজ মসজিদ। এটি চকবাজার ওয়ার্ডের সিরাজুদদৌলা সড়কের পাশে অবস্থিত। মসজিদের প্রতিটি অংশে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার আর সুনিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা লতাণ্ডপাতার নকশা মসজিদের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
১৮৭০ সালে মোঘল স্থাপনা শিল্পের মতো করে মাটি আর চুন সুরকি দিয়ে টিনের ছাদ বিশিষ্ট একটা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুল হামিদ মাস্টার। তার নামানুসারে এই মসজিদের নামকরণ করা হয় হামিদিয়া তাজ মসজিদ। তখনও মাটির দেয়ালে কারুকাজে ভরপুর ছিলো। তার বংশধর ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৪৬ সালে এই মসজিদের সংস্কার কাজে হাত দেন। মসজিদের কারিগর ও নির্মাণ সামগ্রী ভারত থেকে আনা হয়। এতে সেই সময়ের প্রায় পাঁচ লাখ টাকারও অধিক খরচ হয়। চারপাশের দেয়ালগুলো ভেন্টিলেশন সিস্টেমের। দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে আলোর ঝিলিক। আলোর ঝরনাধারায় ভেতরটা করে ঝলমল, আছে বাতাসের কোমল পরশ। মসজিদটির নান্দনিকতা বাড়াতে নির্মাণ করা হয়েছে ১৫টি গম্বুজ। জনশ্রুতি আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গম্বুজ নির্মাণে ব্যবহার করা হয় প্রায় ১৩ টন পিতল ও রুপা। একসময় পিতল নির্মিত সুউচ্চ প্রকাণ্ড গম্বুজটি সূর্যালোকে ঝলমল করতো। তবে এখন সেই নান্দনিকতা নেই।
আবু সৈয়দ দোভাষ একই নকশায় নগরীর কোতোয়ালীর মোড় এলাকায় শ্বশুর বাড়িতেও ১টি মসজিদ তৈরি করেছিলেন। তবে সেটি এই মসজিদ থেকে আকারে ছোট ছিলো। অনেকের কাছে এ মসজিদ চন্দনপুরা বড় মসজিদ বা তাজ মসজিদ নামেও পরিচিত। বর্তমানে মসজিদটির বয়স ১৫০ বছরেরও অধিক। চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে এই মসজিদের ছবি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় ব্যবহার করা হয়। প্রকাশনাগুলোতে এ মসজিদের ছবি থাকায় বিদেশ থেকে পর্যটকরাও আসেন এখানে। আবু সৈয়দ দোভাষ সেই সময়ে কলকাতা থেকে কারিগর ও দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে উপকরণ এনে প্রায় ১৩ শতক জায়গার ওপর দোতলা মসজিদটি গড়ে তুলেন। মসজিদে রয়েছে ছোট-বড় ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে যাওয়ার জন্য আছে সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়িতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোঘল স্থাপত্য নিদর্শনের প্রতিচ্ছবি। গম্বুজের চারপাশে রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ সাহাবির নাম। যখন মাইকের ব্যবহার ছিলো না, তখন ৪ তলা সমান উঁচু মিনারে উঠে আজান দেয়া হতো। এরকম ২টি মিনার এখনও আছে।
মসজিদ কমিটির সদস্য মো. জহুরুল হক বলেন, তার দাদা আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৫০ সালে এ মসজিদ পুনর্র্নিমাণ কাজ শেষ করেন। এখন প্রতি ৫ বছর পর একবার রঙ করা হয়। একবার রঙ করার কাজ শেষ করতে প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগে। এ কাজের কারিগরের অভাবে সংস্কার কাজও সঠিকভাবে করা যায় না বলেও তিনি জানান। বৈরী আবহাওয়ায় এসব জিনিস যেমন নষ্ট হয়েছে তেমনি সংস্কারের সময়ও অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। এখন বড় গম্বুজে সবুজ, গোলাপি ও হলুদ রঙ করেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মসজিদে ১ জন ইমাম, ১ জন হাফেজ ও ২ জন মুয়াজ্জিন রয়েছেন।
মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের খেদমত করছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ এ মসজিদ দেখতে আসেন। আশপাশেও অনেক নতুন মসজিদ গড়ে উঠেছে। এরপরও এ মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, সাধারণত দিনে গড়ে ৮ থেকে ৯শত লোক নামাজ পড়েন এ মসজিদে। শুক্রবারে তা হাজার তিনেক ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদে জায়গা সংকুলন না হলে রাস্তা বন্ধ করে সেখানেই নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা।
মসজিদটির বিপরীতে একটি অগ্নি নির্বাপণ কেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রের লাল ভবনটিও ইংরেজ স্থাপত্যশৈলীর একটি নজরকাড়া নিদর্শন। জানা যায়, দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানেরও স্মৃতি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এখানে জীবনের শেষ জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন তিনি। এর মাত্র ১৩ ঘণ্টা পরেই তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে শাহাদতবরণ করেন।
