ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কর্ডোভা নগরীর জামে মসজিদের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

শামীম আনোয়ার
কর্ডোভা নগরীর জামে মসজিদের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

ঐতিহাসিক ড্রেপার বলেন, ‘অষ্টম শতাব্দীতে যখন কর্ডোভার রাস্তায় বাতি জ্বলত তার ৭০০ বছর পরও লন্ডনে কোনো সরকারি বাতি ছিল না।’ (History of The Intellectual Development of Europe, VOL 2,London, 1910,P -230_31)।

৭১১ খ্রিস্টাব্দ এ উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের শাসনামলে সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলমানরা স্পেন জয় করে। সেই সময় কর্ডোভার সেন্ট ভিনসেণ্ট গির্জার অর্ধেক অংশে একটি মসজিদ স্থাপিত হয়। পরে ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আবদুর রহমান আদ দাখিল স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কর্ডোভা জয় করে সেখানে তার রাজধানী স্থাপন করেন। এ সময় মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তিনি গির্জার অংশ ১ লাখ দিনারে ক্রয় করে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ৭৮৬ সালে মসজিদের কাজ শেষ হয়। নির্মাণকাজে ৮০ হাজার দিনার ব্যয় করা হয়। সময় লেগেছিল ১ বছর। পরে অন্য আমিরদের সময়ে এই মসজিদের নানা রকম সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঘটে। ৯২৯ সালে স্পেনে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান, এ সময়ে মুসলিম জাহানে তিনজন খলিফার অস্তিত্ব ছিল। আব্বাসীয়, ফাতেমীয় ও স্পেনের উমাইয়া খলিফা।

স্পেনের উমাইয়া খিলাফত ১০৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। উমাইয়া আমলে কর্ডোভা নগরী হয়ে উঠেছিল ইউরোপের বাতিঘর। মর্যাদার দিক থেকে এর অবস্থান ছিল বাগদাদ আর কনস্টান্টিনোপল এর পাশাপাশি। এই নগরীর মাঝে ছিল ৩৮০০ মসজিদ, ৮৪০০০ বিপণি, ৯০০ স্নানাগার। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ছিল ৪ লাখ গ্রন্থ। এমনকি বিভিন্ন অঞ্চলের খ্রিষ্টান শাসকদের চিকিৎসকের দরকার হলে তারা কর্ডোভায় দূত প্রেরণ করত। এভাবেই এই নগরীর নাম হয়ে উঠে ‘Jewel of the World’।

মুসলিম আমলে স্পেনে খ্রিষ্টান প্রজাদের সব রকম অধিকার সংরক্ষণ করা হতো। হোল বলেন, ‘খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত নতুন গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং উপাসনার জন্য গির্জার ঘণ্টা বাজানোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।’ (Andalus: Spain under the Muslims,London, 1958) খ্রিষ্টানদের রাজকার্যেও নিয়োগ দেওয়া হতো। তারা বিনা বাধায় সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত। কিন্তু অপরপক্ষে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ক্যাসেলের রাজা তৃতীয় ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলার নেতৃত্বে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের পরাজিত করে কর্ডোভা দখল করে নেয়। সেইসঙ্গে সেখানে গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে একে বলা হয় দা মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা।

১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো এই মসজিদকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে সেখানে দর্শনার্থীরা টিকেট কেটে ঢুকতে পারেন। সেখানে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। এভাবেই এক সময়ের বিখ্যাত মসজিদ আজ গির্জায় পরিণত হয়েছে। ৫০০ বছরের পুরোনো মসজিদে থেমে গেছে আজানের সুর। মুসলমান শাসকদের উদারতার বদলে খ্রিষ্টানরা এর চেয়ে ভালো কোনো প্রতিদান দিতে পারেনি!

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত