ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্বখ্যাত মুসলিম বীর সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর

বিশ্বখ্যাত মুসলিম বীর সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর

মুসা বিন নুসাইর ৬৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নুসাইর আমীর মুয়াবিয়ার প্রহরীদলের প্রধান ছিলেন। প্রশাসন হিসেবে মুসার মেধা ও সাহসিকতার কারণে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। খলিফা আবদুল মালিক তাকে বসরার রাজস্ব আদায়কারী নিয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে তাকে আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তার শাসনাধীনে মিশর থেকে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত বিশাল ভূখ- ছিল। কঠোর হস্তে তিনি তার এলাকা শাসন করতেন এবং অনেক সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বার্বার উপজাতি নতুন গভর্নরের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামরিক যোগ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে গ্রহণ করল আপনজন হিসেবে। এরপর মুসা বিন নুসাইর সফল নেতা হিসেবে। অভিযান পরিচালনা করতে শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই আফ্রিকায় আরব শক্তি সংহত হয় এবং আরবরা উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন অধিকার করতে সক্ষম হয়। মুসা বিন নুসাইর ও তার পুত্ররা একের পর এক সাহসি অভিযান চালিয়ে আফ্রিকার দুর্ধর্ষ উপজাতিগুলোর প্রতিরোধ ভেঙে ফেলেন; গ্রীক ষড়যন্ত্রকারীদের আফ্রিকা হতে বিতাড়িত করেন এবং সমগ্র এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার বিজ্ঞ প্রশাসন ও আপসের মনোভাব বেপরোয়া বার্বারদেরও আপন করে তোলেন এবং তিনি তাদের আস্থাভাজন হন। মুসা বিন নুসাইর সরাসরি খলিফার অধীনে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। বিজিত জাতিগোষ্ঠীর প্রতি শাসকের সহনশীল আচরণ, সাম্য, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসা বিন নুসাইর তাদের হৃদয় জয় করেন। অল্প সময়ের মধ্যে গোটা বার্বার জাতি ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তী বছরগুলোতে তারা ইসলামের দুর্ধর্ষ শক্তিতে পরিণত হয় এবং ইসলামের পতাকাকে ফ্রান্সের কেন্দ্র পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায়।

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত বাইজান্টাইন নৌবাহিনী কর্তৃক নানাভাবে উৎপীড়িত হত। মুসা বিন নুসাইর এই ঝামেলা হতে নিজের শাসনাধীন এলাকাকে নিরাপদে রাখার জন্য একটি অভিযান পরিচালনা করে কৌশলগত ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মাজেরকা, মিনোরকা ও ইন্ডিকা দখল করেন। ইসলামি শাসনাধীনে আসার পর দ্বীপগুলোতে দ্রুত সমৃদ্ধি সাধিত হতে থাকে। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, ‘ব্যাপকতার দিক থেকে মুসা বিন নুসাইর এর শাসনের আওতা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রায় সমান। কিন্তু প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সামরিক নেতৃত্বের দিক থেকে তার গুরুত্ব আরও অধিক।

মুসা বিন নুসাইর আফ্রিকা থেকে রোমানদের চিরদিনের জন্য বিদায় করেছিলেন এবং মুসলিম বিজয়কে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবে মুসলমানদের ইউরোপ অভিযানের পটভূমি তৈরি করেছিলেন তিনি। ৭১০ সালে তিনি স্পেন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তার সুযোগ্য সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে পরবর্তী সময়ে বছরই মাত্র সাত হাজার সৈন্যসহ তারিককে স্পেন অভিযানে পাঠানো হয়। রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনী ও তারিকের ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে বারবেট নদীর মোহনায় চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটে। রডারিকের নেতৃত্বে খ্রিষ্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। তারিকের বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। এই যুদ্ধের পর বিজয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়ে তারিক স্পেনের অন্যান্য এলাকা দখল করার জন্য অভিযানে নেমে পড়েন। এজন্য তাকে খুব সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে। হয়। কারণ খ্রিষ্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছিল। এক বছর পর মুসা বিন নুসাইর স্বয়ং স্পেনে উপস্থিত হন। তার সঙ্গে ছিল ১০ হাজার সৈন্য। তিনি ভিন্ন। পথে ঝড়ের গতিতে অভিযান চালিয়ে মেরিডা, সিডোনিয়া ও সেভিল দখল করেন। টলেডোতে মুসা বিন নুসাইর তার সুযোগ্য সেনাপতি তারিকের সঙ্গে মিলিত হন এবং দুই বিজেতার সম্মিলিত আক্রমণের মুখে খ্রিষ্টান বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে পিরেনিজত পর্বতের দিকে চলে যায়। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে সমগ্র স্পেন মুসলিম। শাসনাধীনে চলে আসে। কয়েক বছর পর মুসলিম বাহিনী পর্তুগাল দখল করে এবং পর্তুগালের নামকরণ করা হয় আল গারব (পশ্চিম)।

তারিকের বাহিনীকে স্পেনে রেখে মুসা বিন নুসাইর ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হন এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি অঞ্চল করায়ত্ত করেন। পিরেনিজ পর্বতে দাঁড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর সমগ্র ইউরোপ বিজয়ের কথা ভেবেছিলেন। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, ‘তাকে যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই সফল হতেন। পাশ্চাত্য সম্পূর্ণরূপে তার পদানত হতো। কিন্তু দামেস্কের দরবারে সতর্কতামূলক ও দ্বিধান্বিত নীতি গ্রহণের ফলে মুসলমানদের এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়।

মুসা বিন নুসাইর যখন পিরেনিজ পর্বতে মুসলমানদের ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণকারী কিছু খ্রিষ্টান দল কর্তৃক বিঘœ সৃষ্টির আশঙ্কা চিরতরে নির্মূল করার প্রচেষ্টায়। লিপ্ত ছিলেন, তখন খলিফা তাকে ও তারিককে দামেস্কে তলব করলেন। মুসা বিন নুসাইর খলিফার আদেশ অগ্রাহ্য না করে বিজয়ীর বেশে আফ্রিকায় ফিরে আসেন। কিন্তু নতুন উমাইয়া খলিফা সোলাইমান তাকে যথাযথ মর্যাদা সহকারে গ্রহণ করেননি। মুসা বিন নুসাইর অবসর জীবন কাটিয়ে ৭১৬ অথবা ৭১৭ সালে সিরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। স্পেন ত্যাগের আগে মুসা বিন নুসাইর দেশটির শাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করেছিলেন। সেভিলে মুসলিম শাসনের কেন্দ্র স্থাপন করে তার এক পুত্রকে স্পেনের গভর্নর নিয়োগ করেন। আরেক পুত্র আবদুল্লাহকে আফ্রিকা শাসনের। দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। উভয় পুত্র বিরাট যোদ্ধা ও প্রশাসক ছিলেন। মুসলিম বিজেতারা যে শৃঙ্খলা প্রদর্শন করে গেছেন, তা বিশ্বের সামরিক বিজয়ের ক্ষেত্রে নজীরবিহীন। যখন সমগ্র ইউরোপ মুসা বিন নুসাইরের পদতলে এবং তিনি বিজয়সূচক অভিযানের জন্য প্রস্তুত, ঠিক সেই মুহূর্তে দামেস্ক হতে খলিফার নির্দেশ আসায় তিনি অভিযান ত্যাগ করে খলিফার নির্দেশকেই শিরোধার্য বিবেচনা করে দামেস্কে রওয়ানা হওয়ার মাধ্যমে এই শৃঙ্খলার নজীর স্থাপন করে গেছেন।

মুসা বিন নুসাইর ছিলেন একজন সেরা যোদ্ধা, যোগ্য সেনাপতি এবং বিজ্ঞ প্রশাসক; সর্বোপরি তিনি ছিলেন কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার হাতে বন্দি। এ ধরনের সুযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমেই ইসলাম তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং অল্পসময়ের মধ্যে বিশ্বের সুবিস্তৃত ভূখ-ে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভাকেইসর্ডোভাই হিল্লোকেন্দ্রে পাকও ছাড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন জিয়াদ স্পেনে ইসলামি রাষ্ট্রের যে ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে দিনে দিনে মুসলিম সভ্যতার চরম বিকাশ ঘটে। মুসলিম শাসনামলে কর্ডোভাকে ইসলামি ঐতিহ্যে এত সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা হয়েছিল যে, সমগ্র ইউরোপে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভাই ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ও জাঁকজমকপূর্ণ নগরী। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের সেরা শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি মিশরের আল আজহার ও বাগদাদের নিজামিয়াকেও ছাড়িয়ে যায়। ইসলামের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পেনীয় ইতিহাসের ইসলামি যুগকে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং সেজন্য যদি কাউকে কৃতিত্ব দিতে হয়, তাহলে তা অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক মুসা বিন নুসাইরের। জাবাল মুসা বলা হয় যে, এটি মুসা বিন নুসাইরের নামে নামকরণ করা হয়েছে।

আলোকিত ডেস্ক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত