প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ আগস্ট, ২০২১
বাগদাদ। এককালের আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী। শুধু আব্বাসিদের নয়, এককালে এটি পুরো বিশ্বের রাজধানী ছিল। এই শহরের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মুসলিমদের সোনালি ইতিহাস। এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আবু জাফর মানসুর। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) এ শহরকে বাগদাদ নামে ডাকা পছন্দ করতেন না। তার মতে, বাগদাদ শব্দের অর্থ দেবতার দান। তিনি এই শহরকে বলেন মদিনাতুস সালাম, যে নামটি রেখেছিলেন শহরের প্রতিষ্ঠাতা আবু জাফর মানসুর। শুধু আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক নন, ইমাম আসমাঈ (রহ.)ও এই মত পোষণ করেন। তবে আলেমদের অন্য অংশের মতে বাগদাদ মূলত বাগ ও দাদ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ দাদ নামক এক ব্যক্তির বাগান।
বাগদাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর। এ শহর প্রতিষ্ঠার আগে তিনি কুফার সীমান্তবর্তী একটি শহর হাশিমিয়্যাতে অবস্থান করতেন। ১৪১ হিজরিতে এই শহরে আবু জাফর মানসুরের ওপর একটি হামলা চালানো হয়, যার ফলে তিনি বাধ্য হন নিজের জন্য নিরাপদ একটি আবাসস্থল খুঁজে নিতে। এই হামলার পেছনের ঘটনাটি বেশ রোমাঞ্চকর। ১৩৬ হিজরিতে আবু জাফর মানসুরের হাতে নিহত হন আবু মুসলিম খোরাসানি। তিনি ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি, আব্বাসিদের উত্থানে যার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি নিহত হন। আবু মুসলিম খোরাসানির হত্যাকা-ের পর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল রাওয়ান্দিয়া ফিরকার লোকরা। তারা ছিল খোরাসানের বাসিন্দা। আবু মুসলিম তার আন্দোলনে তাদের নিজের সঙ্গে রেখেছিলেন। ফলে তার সঙ্গে এই ফিরকার লোকদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ফিরকার লোকেরা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, আদম (আ.) এর রুহ আবু মুসলিম খোরাসানির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল। আবু মুসলিমের মৃত্যুর পর তা স্থানান্তরিত হয়েছে উসমান ইবনে রাহিকের মধ্যে। তিনি ছিলেন খলিফার প্রহরী দলের প্রধান। এই ফিরকার লোকদের বিশ্বাস ছিল, তাদের খাবার ও পানিয়ের জোগানদাতা হলেন আবু জাফর মানসুর। তিনিই তাদের প্রভু। একদিন তারা দলবদ্ধভাবে হাশিমিয়্যা শহরে এসে খলিফার প্রাসাদের চারপাশে তাওয়াফের মতো ঘুরতে থাকে। এসময় তারা বলছিল, এটি আমাদের রবের প্রাসাদ। খলিফা তখন তাদের ২০০ জনকে বন্দি করেন। এতে তারা মানসুরের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা বলতে থাকে, আপনি কেন আমাদের লোকদের গ্রেপ্তার করলেন। তারা কারাগারে হামলা করে নিজেদের লোকদের মুক্ত করে। ক্রমেই হট্টগোল ও কোলাহল বাড়তে থাকে। তাদের লোকরা শহরের ফটক বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যে খলিফাকে তারা নিজেদের প্রভু বলে বিশ্বাস করত, তার ওপরই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাকে হত্যা করার জন্য একে অপরকে উত্তেজিত করতে থাকে। খলিফা তাদের শান্ত করার জন্য প্রাসাদ থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় তিনি ছিলেন অনেকটাই অরক্ষিত। রাওয়ান্দিরা তাকে ঘিরে ফেলে। খলিফার ভাগ্য ভালো, কোনো বিপদ হওয়ার আগেই শহরের নিয়মিত সেনাবাহিনী এগিয়ে আসে এবং তারা রাওয়ান্দিদের কচুকাটা করে ফেলে। এরপর আর কখনও তাদের দেখা যায়নি। কিন্তু এই ঘটনার ফলে খলিফা সিদ্ধান্ত নেন, নিজের জন্য তিনি একটি নিরাপদ শহর নির্মাণ করবেন। খলিফা তার লোকজন নিয়ে কুফা থেকে বের হন। তিনি বিভিন্ন এলাকা সফর করে বর্তমানে যেখানে বাগদাদ শহরের অবস্থান, এই এলাকায় পৌঁছেন। খলিফা লক্ষ্য করলেন এই খালি জায়গাটা নদীর তীরে অবস্থিত। ফলে যে কোনো অঞ্চল থেকে এখানে সহজে জলপথে জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করা যাবে। খলিফা এখানে কয়েক রাত অবস্থান করলেন তাঁবু খাটিয়ে। দেখলেন এখানে সবসময় নির্মল মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহিত হয়, ফলে বসবাসের জন্য জায়গাটা বেশ চমৎকার। খলিফার নির্দেশে শুরু হলো শহরের নির্মাণকাজ। খলিফার আদেশে শহরের মাঝখানে নির্মাণ করা হয় প্রাসাদ। এর পাশে নির্মাণ করা হয় জামে মসজিদ। পরে এটি প্রসিদ্ধ হয় জামে আবু জাফর মানসুর নামে।
আলোকিত ডেস্ক