মুসলিম ও ব্রিটিশ আমলে নারী শিক্ষা : মিথ্যাচার ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সুলতান সুলেমান খান

ছোটবেলা থেকে আমাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় যে, মধ্যযুগ তথা মুসলিম ও ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষের মুসলিম নারীরা নাকি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। তারা নাকি ছিল অশিক্ষিত মূর্খ। পরে ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় নাকি নারীরা শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এম এ রহিম তার গ্রন্থ বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মুসলিম আমলে নারীশিক্ষার বিষয়টি ভালোভাবে আলোকপাত করেছেন।

মুসলিম আমলে ভারতে মুসলিমরা ছেলেদের পাশাপাশি নারীদের শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। তৎকালীন সমাজে শিক্ষা গ্রহণ মুসলিমদের মূল নীতির মধ্যে অন্যতম ছিল। কন্যাকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা তখনকার সময়ে পিতা-মাতারা ধর্মীয় কর্তব্য মনে করতেন। সে সময় নারীদের কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষাটা গ্রহণ করা এক প্রকার বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল সামাজিকভাবে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ধনী ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত সাধারণত। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার পর খরচ অনেক বেড়ে যেত, যার কারণে দরিদ্র নারীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসমর্থ হতো।

আপনি কি জানেন মুসলিম আমলে নারীরা অনেক বেশি শিক্ষিতা ও সংস্কৃতিবান ছিলেন? সতিউন্নেসা নামের এক উচ্চ শিক্ষিতা নারী মুঘল আমলে অনেক বিখ্যাত ছিলেন। তার কাছে অনেক মুঘল রমণী শিক্ষা গ্রহণ করত। হাফিজা নামের আরেক প্রতিভাসম্পন্ন নারীর খোঁজ পাওয়া যায়। তিনিও মুঘল আমলে একজন বিখ্যাত নারী প-িত ছিলেন।

বাংলায় মল্লিকা নাম্নী এক মুসলিম নারী ছিলেন, যিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন জায়গায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। গদাই মল্লিকের পুঁথি থেকে জানা যায়, তার সম্পর্কে অনেক কিছু। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, যে পুরুষ তাকে ইতিহাস বিতর্কে হারাতে পারবে, তাকেই তিনি বিয়ে করবেন। অনেকেই তার কাছে হেরে যান বিতর্কে। শেষে হাকিম গদাই নামের একজন সুফি প-িত তাকে বিতর্কে হারান এবং মল্লিকাকে বিয়ে করেন।

ব্রিটিশরা একের পর এক মুসলিম রাজ্য ধ্বংস করে অনেক ইতিহাস নষ্ট করে দিয়েছে, অনেক গ্রন্থ কিতাবাদি লুট করেছিল। যার কারণে অনেক ইতিহাস এখনও ধামাচাপা পড়ে আছে। তবে এম এ রহিম সাহেব জোর গলায় বলেন, মুসলিম আমলে নারীশিক্ষা ছিল তাদের ঐতিহ্যগত প্রথা। ব্রিটিশদের হাতে সর্বপ্রথম পতন ঘটে বাংলার মুর্শিদাবাদের। মুর্শিদাবাদ তখন হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞানীদের আনাগোনার জায়গা। ইংরেজ শ্বেতাঙ্গরা ধ্বংস করে একের পর এক গ্রন্থাগার। লুট করে নেয় অনেক বই। অনতিকাল পরই অসংখ্য মুসলিম রাজ্য দখল করে তারা সেখানে লুটপাট ও ধ্বংস চালায়। একের পর এক সুফি খানকা, গ্রন্থাগার ধ্বংসের ফলে মুসলিমদের শিক্ষা গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। মুসলিমদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য একমাত্র অবশিষ্ট থাকে মাইশুর রাজ্য। ১৭৯৯ সালে সেখানেও মুসলিমদের পতন ঘটে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, রকেট প্রযুক্তি লুট করে নেয় ব্রিটিশরা।

মুসলিমরা তখন শিক্ষা গ্রহণ করত আরবি, ফারসি ভাষায়। কিন্তু ব্রিটিশরা সেসব লুট করে নিলে মুসলিমরা ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে থাকে। ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে পুরোপুরি থাকলেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে উঠত। কিন্তু মাদ্রাসাগুলোকেও ব্রিটিশরা ছাড় দেয় না, সেখানে তারা সব সময় নজরদারি চালাত।

ব্রিটিশদের ভারতে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা ছিল মুসলিমরা। কারণ তারা ভালোভাবেই জানত মুসলিমরা তাদের শাসন কোনোদিনও মেনে নেবে না। তাই তারা একটা জাতিকেই পঙ্গু করে দিল। অন্যদিকে তারা বিভিন্ন মিশনারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেও মুসলিমরা সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। কারণ মুসলিমদের ভয় ছিল, তারা যেন ফেতনায় জড়িয়ে না পড়ে। অন্যদিকে হিন্দুরা ব্রিটিশদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে। ব্রিটিশরা মুসলিমদের শিক্ষা গ্রহণের প্রতিটি দরজা বন্ধ রেখে একমাত্র তাদের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা খোলা রাখে।

কথিত রয়েছে, ব্রিটিশরা এই বাংলাতেই হাজার হাজার মাদ্রাসা ধ্বংস করেছিল। যেখানে ধর্ম, কৃষিবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা শিক্ষা দেওয়া হতো। র?্যালফ ফিচ এরকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পাশ্চাত্যের স্কুল-কলেজের সঙ্গে তুলনা করেছিল। অর্থাৎ তারা তাদের ভাষায় স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বুঝাত এই অঞ্চলের মানুষ সেগুলোকে মক্তব, আলিম ও ফাজিল বলত। পরে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বল্প পরিসরে মুসলিমরাও যাতায়াত শুরু করে। তবে মুসলিম নারীদের ফেতনার ভয়ে তখনও সেসব মিশনারি প্রভাবিত স্কুল-কলেজে পাঠায়নি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে বেগম ফয়জুন্নেসা ও অন্য কিছু মনীষী মুসলিম নারীদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করে এবং মুসলিম নারীরা সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তা জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম ছিল। কিন্তু আমাদের ছোটবেলা থেকেই মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মধ্যযুগ তথা মুসলিম এবং ব্রিটিশ আমলে মুসলিম নারীরা ছিল অশিক্ষিত মূর্খ। আর এর জন্য তারা পর্দা বিধানকে দায়ী করে। পর্দার মতো অকাট্য ফরজ বিধানকে প্রথা বলে কটাক্ষ করে। কিন্তু মুসলিম আমলে পর্দার বিধান আরও বেশি মানা হতো। তখন তো মুসলিম নারীরা শিক্ষিত ছিল। ব্রিটিশ আমলে এমন কী হলো যে, পর্দার কারণে মুসলিম নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না?

আমাদের এই বিকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া বেশ জরুরি। পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস পর্যন্ত নিজের জ্ঞান সীমাবদ্ধ রাখবেন না। এই বাংলার, এই হিন্দুস্তানের ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করুন। যদি বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকে তাহলে বুঝতে পারবেন আমাদের কী পরিমাণ মিথ্যা ইতিহাস শেখানো হয়।

সূত্র : বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস

মধ্যযুগ, সুলতানি ও মুঘল আমলের গ্রন্থাগার

https://www.bbc.com/bengali/new