
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা নিয়ে লবণ চাষ শুরু করেছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাষিরা। জমিতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি জমিয়ে তাতে সূর্যের তাপ দিয়ে পানি শুকিয়ে তৈরি হয় লবণ। এ উপজেলার বঙ্গোপসাগরে উপকূল বেষ্টিত বিভিন্ন ইউনিয়নে লবণ উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। সবেমাত্র এ জায়গার চিংড়িঘের গুটিয়ে মাঠ তৈরি করে লবণ উৎপাদন করছেন তারা। লবণ চাষের সাফল্যকে পুঁজি করে এ বছরও চাষিরা পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছেন। বিগত অর্থ বছরগুলোতে লবণের ব্যাপক হারে দাম পাওয়ায় চাষিরা এবারও লবণ উৎপাদন করতে উৎসাহ পেয়েছেন। ফলে মজুতকৃত লবণ বিক্রির পাশাপাশি লবণমাঠ তৈরিরও ধুম পড়েছে। বিগত দিনের মজুতকৃত লবণগুলো ৫ থেকে ৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। অথচ এ লবণ এখন খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে প্রতি কানি (৪০ শতক) জমি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় লাগিয়ত নেওয়া যেত। প্রতি কানিতে চাষাবাদে খরচ পড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এতে লাভ হয় খরচের দ্বিগুণ। তবে বর্তমানে প্রতি কানি জমিতে লাগিয়ত ১৫ হাজার টাকার পরও খরচ হয় পলিথিন ৬ হাজার, পানি সেচ ৪ হাজার ও মজুরি ৩০ হাজার টাকা। এতে প্রতি কানিতে খরচ পড়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। প্রতি কানিতে ৩০০ মণ লবণ উৎপাদন হয়। কিন্তু কম দামে বেচে চাষিরা হতাশায় ভোগেন। প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে ২৫০ টাকার বেশি খরচ হলেও চাষিরা প্রথমে ৩০০ ও পরবর্তীতে ২৬০ টাকা থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে খরচ এবং লভাংশ প্রায় সমান সমান। এতে চাষিরা লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবুও চাষিদের মজুতকৃত লবণ বিক্রির ধুম পড়েছে। প্রথম দিকে চাষিরা প্রতিমণ লবণ ২৯০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কমে আসবে। দেশের কক্সবাজার এবং খুলনার পর চট্টগ্রামের একমাত্র বাঁশখালীতেই লবণ উৎপাদন হয়। বাঁশখালীতে ছনুয়া, সেখেরখীল, গ-ামারা, সরল, পশ্চিম মনকিচর, কাথরিয়া, খানখানাবাদ, পুঁইছুড়ি (আংশিক) এলাকার লবণ উৎপাদনে অগ্রগামী। চাহিদা কম থাকায় বেশ কিছু ব্যবসায়ী লবণ মজুত করে রাখেন। এ লবণের দাম তেমন না বাড়লেও চাষিরা মজুতকৃত লবণ বিক্রির করতে মেতে উঠেছেন। সরেজমিন গত মঙ্গলবার উপজেলার গ-ামারা, ছনুয়া, সরল, শেখেরখীল ইউনিয়নের এলাকা পরির্দশনকালে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ তিন ইউনিয়নে কয়েক হাজার একর মাঠজুড়ে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছে অর্ধশতাধিক চাষি পরিবার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাষিদের অন্য কোনো কাজ করার সময় থাকে না। তবে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় গত উৎপাদন মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মজুত রয়েছে বিপুল পরিমাণ লবণ। ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন অব্যাহত থাকে। উপকূলের অধিকাংশ মানুষের লবণ চাষে আগ্রহ থাকলেও নায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। উপকূলের উপজেলাতে দুই ধরনের পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন হয়। বর্তমানে সরকার লবণচাষিদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় চাষিরা পূর্ণ শ্রম লবণ মাঠে লাগাচ্ছেন। বাঁশখালীতে উৎপাদিত লবণ বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারা দেশে বাজারজাত করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় নিজস্ব তদারকির মাধ্যমে লবণ উৎপাদন ও বাজারজাত করে। ছনুয়া খুদুকখালী এলাকার চাষি রেজাউল করিম বলেন, আমি প্রতি বছর ১২ কানি জমিতে লবণ চাষ করি। প্রতি কানি জমিতে পলিথিন ৬ হাজার, পানি সেচ ৪ হাজার, মজুরি ৩০ হাজার ও জমির লাগিয়ত ২০ হাজার টাকা খরচ করি। প্রতি কানিতে খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। লবণ উৎপাদন হয় কানিতে ৩০০ মণ। আমরা প্রতি মণ বিক্রি করি মাত্র ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। খরচ আর উৎপাদনে তেমন কোনো লাভ হয় না। গতবছর ১২ কানি জমিতে ৪ লাখ টাকা লোকসান ছিল। বিদেশি লবণের কারণে স্থানীয় চাষিরা লবণের দাম পান না। বর্তমানে লোকসানের কারণে বহু চাষি লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। সরল এলাকার চাষি ইয়াছিন, শাহেদ, মোজাফ্ফর, আরিফ, খালেদ জানান, লবণের চাষ এবারও প্রতি বছরের মতো খুব ভালো হবে বলে আশা করি। সরকার যদি বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় উৎপাদিত এসব লবণ দেশের সর্বত্র সরবরাহ করতে সহযোগিতা করে, তাহলে এখানকার লবণ চাষিরা আরও বেশি উপকৃত হবেন। তারা এ লবণ শিল্প রক্ষা এবং মানসম্মত লবণ উৎপাদনে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। বাঁশখালীর গন্ডামারা এলাকার বিশিষ্ট লবণ ব্যবসায়ী আবু আহমদ বলেন, বাঁশখালীতে যে লবণ উৎপাদন হয় তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বাইরেও রপ্তানি করা যাবে। কিন্তু কিছু ব্যবসায়ী ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য বাইরে থেকে লবণ আমদানি করে দেশে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। বর্তমান সরকার তা কঠোর হস্তে দমন করায় বাঁশখালীতে বর্তমানে অর্ধলক্ষাধিক চািষ লবণের ন্যায্যমূল্য ও পরিশ্রমের যথাযথ মর্যাদা পাবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছেন। এ ব্যাপারে লবণ ব্যবসায়ী আনিছুর আলী বলেন, লবণ চাষের জন্য প্রথমে জমিকে ছোট ছোট ভাগ করে নেওয়া হয়। এরপর ভেজা মাটিকে রোলার দিয়ে সমান করে বিছিয়ে দেওয়া হয় মোটা পলিথিন। জোয়ার এলেই মাঠের মাঝখানে তৈরি করা গর্তে জমানো হয় সাগরের লবণ পানি। বালতি ভরে বিছানো পলিথিনের উপর রাখা হয় পানি। রোদে জলীয় বাষ্প হয়ে উড়ে যায় পানি। ফলে মাঠে জমে লবণের আস্তরণ। সে লবণ তুলে স্তূপ করে রাখা হলে অবশিষ্ট পানি সরে যায়। পূর্বের চেয়ে বেড়ে এখন লবণের দাম মণপ্রতি ২৯০ থেকে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। দাম বৃদ্ধি না হলেও চাষিরা তাদের মজুতকৃত লবণ বিক্রি করছেন। সামনে এ দাম না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই তারা তাদের মজুদ লবণ তড়িগড়ি বিক্রি করে দিচ্ছেন। ছনুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ বলেন, এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ লবণ চাষ করেন। যুগ যুগ ধরে এ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ কম খরচে বেশি লাভ পাওয়ার আশায় লবণ চাষ করে থাকেন। এ ইউনিয়নটি লবণ শিল্পে সমৃদ্ধ বললেও চলে। বর্তমানে আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ চাষি ন্যায্যমূল্য পাবেন আশায় লবণের মাঠে রাত-দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।