ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

লালমনিরহাটের সিন্দুরমতি দিঘি

লালমনিরহাটের সিন্দুরমতি দিঘি

লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নে ১৬ একর ৫ শতক আয়তনবিশিষ্ট সিন্দুরমতি দিঘি অবস্থিত। জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ বছর পূর্বে শ্রীলঙ্কা থেকে রাজা নারায়ণ চক্রবর্তী নামে একজন নিঃসন্তান ব্রাহ্মণ জমিদার সন্তান লাভের আশায় সস্ত্রীক তীর্থ স্থান ভ্রমণে বেড়িয়ে নৌপথে এখানকার দেউল সাগর মন্দিরে এসেছিলেন। তখন দেউল সাগর হিন্দুদের একটি প্রসিদ্ধ তীর্থ স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রাচীর মন্দিরটি চারিদিক থেকে পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী এবং তার ধার্মিক স্ত্রী শ্রীমতী মেনেকা দেবী এখানে ত্রিদিবস-রজনী যাপনের পর এখানের মনোরম পরিবেশের আকর্ষণে আর ফিরে যাননি। এখানে তারা নতুন আবাসস্থল গড়ে তোলেন। তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে প্রত্যন্ত এ এলাকা পরিণত হয় ঐশ্বর্যমণ্ডিত এক শান্তির রাজ্যে। প্রতিষ্ঠিত হয় রাজ নারায়ণ চত্রুবর্তীর জমিদারিত্ব।

এদিকে শ্রীমতী মেনেকা দেবীর গর্ভ থেকে জন্ম নেয় অপরূপা দুই কন্যা নাম রাখেন- সিন্দুর ও মতি। দিনে দিনে সিন্দুর ও মতি শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেন। এ সময় জমিদারের সুখী সমৃদ্ধ রাজ্যে আকস্মিকভাবে দেয় তীব্র খরা। খাল-বিল সব শুকিয়ে যায়। পানীয় জলের জন্য রাজ্যজুড়ে হাহাকার পড়ে যায়। এমতাবস্থায় জমিদার প্রজাদের জলকষ্ট নিবারণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি বিশাল দিঘি খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অন্যত্র থেকে নিয়ে আসা হয় কয়েক হাজার শ্রমিক। তারা দিনের পর দিন দিঘি খনন করতে থাকে, কিন্তু জলের সন্ধান মিলে না। চিন্তিত জমিদার এক রাতে স্বপ্নাদেশে জানতে পারেন যে, তার দুই কন্যা দিঘির মাঝখানে যথারীতি উপাচারসহ ভগবানের পূজা করলে তবেই জল আসবে। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী জমিদার রাম-নবমীর দিনের পূজার আয়োজন করেন। এ খবর শুনে এলাকার লোকজন এসে দিঘির পাড়ে জমায়েত হতে থাকেন। জমিদার তার আদরের দুই কন্যাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে দিঘির পাড়ে এসে হাজির হন। সিন্দুরের পরনে ছিল লাল শাড়ি আর মতির পরনে সাদা শাড়ি। দিঘির মাঝখানে আলপনা এঁকে পূজার নৈবেদ্যসমুহ সুবিন্যাস্তভাবে সাজানে হয়। পাঠা বলি দিয়ে পূজার কার্য শুরু করা হয়। চারিদিকে ঢাক-ঢোল বাজতে থাকে। সবার দৃষ্টি দিঘির তলদেশের দিকে, কিন্তু সামান্যতমও জল উঠল না। হঠাৎ জমিদারের মনে পড়ে যায় যে, ভুল বশত তুলসী পাতা আনা হয়নি। সিন্দুর ও মতিকে দিঘির তলদেশে রেখে তুলসী পাতা আনতে তিনি ছুটে যান পুষ্প কাননে। সহসা দিঘির তলদেশ ভেদ করে বিকট শব্দে তীব্র বেগে জলরাশি বের হয়ে মিমিষেই দিঘি জলে পূর্ণ হয়ে যায়। পূজার চালুনি-বাতি ও নৈবেদ্যসহ বলিকৃত পাঠা জলের উপর ভেসে ওঠে। ঢাক- ঢোল বাদকরা কোনো রকমে সাতরিয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসে, কিন্তু সিন্দুর আর মতি থেকে যায় দিঘির তলদেশে। ব্রাক্ষ্মণ জমিদার ছুটে এসে দেখেন যে, জল দিয়ে দিঘি কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তার আদরের কন্যাদ্বয়? তারা আর জীবিত নেই শুনে শোকে মুর্ছিত হয়ে দিঘিরপাড়ে আছড়ে পড়েন তিনি। মেনেকা দেবীও কন্যার শোকে এ দিঘির জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্ম বিসর্জনের জন্য উন্মাদের মতো প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন। রমণীরা তাকে ধরে অসুস্থ অবস্থায় প্রাসাদে নিয়ে যায়। দুই কন্যার মৃত্যুতে শোকাহত জমিদার রাতে দৈব বাণীযোগে অবগত হন যে, তার কন্যাদ্বয়ের মৃত্যু হয়নি। তারা দিঘির তলদেশে দেবত্বপ্রাপ্ত হয়ে অমরত্ব লাভ করেছেন। এমন দৈব বাণীতে তিনি মনে সান্ত¡না পেলেন না। দুই কন্যাকে একবারের জন্য হলেও দেখতে চান তিনি। তার সে আশা পূরণ হয়েছিল। ঘটনার আট দিন পর সূর্যোদয়ের পূর্বে জমিদার ও তার স্ত্রী তাদের দুই কন্যা নিজ নিজ শাড়ির আঁচল এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলী দিঘির জলের উপর তুলে দেখিয়েছিলেন। এ সময় তারা দেবত্বপ্রাপ্ত দুই কন্যা সিন্দুর ও মতির সঙ্গে কথাও বলেছিলেন বলে জানা যায়। মানবী থেকে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত এ দুই কন্যার নামানুসারের দিঘিসহ এলাকাটির নাম হয়েছে সিন্দুরমতি। প্রতি বছর চৈত্র মাসের রাম-নবমীতে সিন্দুরমতির পূজা উপলক্ষ্যে এখনও দিঘির পাড়ে বিরাট মেলা বসে এবং শত শত পাঠা বলি দেয়া হয়। রাম-নবমীতে দূরদূরান্ত থেকে অগনিত দম্পতি এখানে আসে যুগল স্নানের জন্য। সুখ-শান্তিময় দাম্পত্য জীবন লাভের আশায় তারা প্রাতকালে এ দিঘির জলে ডুব দেয়। প্রাচীনকাল থেকেই এ প্রথা চলে আসছে।

সিন্দুরমতি দিঘির কিছু আশ্চর্য ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলা ১৩৫৬ সালের আষাঢ় মাসে হঠাৎ একদিন এ দিঘির জল শ্যামলা রং ধারণ করে। দ্বিতীয় দিন লাল রং এবং তৃতীয় দিনে সাদা রং ধারণ করে। যা স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েক হাজার জনগণ অবলোকন করেন। সিন্দুর ও মতির প্রতি এলাকাবাসীর অবজ্ঞার কারণে এ ধরনের সংকেত প্রদর্শিত হয়েছে, অমঙ্গলের পূর্বাভাস- এ বিশ্বাসে এলাকাবাসী দিঘির পাড়ে এক মাসব্যাপী ‘নাম যঞ্জ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সিন্দুরমতির পূজার জন্য দিঘির উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে তাদের প্রতিমাসম্বলিত একটি মন্দির। বিদ্যমান ইস্টক নির্মিত মন্দিরটির স্থাপনকাল সম্পর্কে জানা যায়নি, তবে এর প্রথম সংস্কার ঘটেছিল বাংলা ১৩৭৬ সালে শ্রী পঞ্চুরাম সরকারের বদান্যতায়। এর সর্বশেষ সংস্কার ঘটে বাংলা ১৪০০ সালে শ্রী কামিনী মোহন সরকারের মাধ্যমে। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সিন্দুরমতি দিঘি সরকারি উদ্যোগে আংশিকভাবে পুনর্খননের সময় এখানে মূল্যবান অনেক মুদ্রা, মূর্তি ও পাথর পাওয়া যায়, যা জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। আবার ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে পাকা ঘাট নির্মাণের জন্য এ দিঘির উত্তর পাড়ে খনন করা হলে প্রাচীন একটি ঘাটের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায় এবং কয়েকটি অক্ষত সাদা পাথর উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় হিন্দু পুণ্যার্থী নিবারণ চন্দ্র বর্মণ জানান, তিনি শৈশব থেকেই তার স্বর্গীয় ঠাকুরদা মনরঞ্জনের কাছে সিন্দুরমতি মেলার অনেক গল্প শুনেছিলেন। রাম-নবমীতে তিনি তার স্ত্রীসহ এখানে আসে যুগল স্নানের জন্য। সিন্দুরমতি মন্দির কমিটির সদস্য অম্বিকাচরণ রায় বলেন, মেলায় এসে দিঘিতে দম্পতিরা স্নান করলে সুখ-শান্তিময় দাম্পত্য জীবন লাভ করে। এখানে প্রতিবছর মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও পাশের দেশ ভারত থেকে হাজার হাজার দম্পতি, পূণ্য লাভের আশায় এ দিঘিতে আসেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত