বিষখালীর মোহনায় অতিথি পাখির মিলনমেলা
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রুহুল আমীন রুবেল, ঝালকাঠি

ঝালকাঠির বিষখালী নদীর মোহনায় আশ্রয় নিয়েছে শীতকালীন অতিথি পাখি। পাখিরা আশ্রয় নিয়েছে বিষখালী নদীর পশ্চিম পাড়ে গাবখান ধানসিঁড়ি ইউপির ভাটারাকান্দা ও পোনাবালিয়া ইউপির দিয়াকূল গ্রামের নদী তীরবর্তী এলাকায়। পাখির কিচিরমিচির কলকাকলিতে মুখর বিষখালী নদী তীরবর্তী এসব এলাকা। শৈল্পিক রূপে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য মুগ্ধ করে এলাকাবাসি ও পর্যটকদের। সদর উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান, বাসন্ডা ও ধানসিঁড়ি নদী। এই নদীগুলোর মোহনার পশ্চিমদিকে গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পোনাবালিয়া ইউনিয়ন এবং উত্তর-পূর্ব কোণে ঝালকাঠি পৌর এলাকা।
জানা গেছে, প্রতিবছর শীতে দূর-দূরান্ত থেকে শীতের পাখিরা আসে আমাদের দেশে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ পাখি দেখতে ভিড় করে নদী তীরের বিভিন্ন স্থানে। পাখিদের কলকাকলি প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। আবাসিক ও অতিথি পাখি মিলে আমাদের দেশে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০ প্রজাতির পাখি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি অতিথি পাখি। সব অতিথি পাখি শীতের সবসময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির মধ্যে ২৯০টি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়। পাখিপ্রেমী শামসুল হক মনু জানান, শীত এলেই জলাশয়, নদীর তীরের নিরাপদস্থানসহ বিভিন্ন হাওর, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানা রং-বেরংয়ের নাম জানা, অজানা পাখির। অথচ বেআইনিভাবে শিকার হচ্ছে এসব পাখি। অতিথি পাখি আমাদের বন্ধু, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব ও আমাদের প্রেরণা।
এ পাখিগুলোকে অচেনা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাদের বন্ধুসুলভ আচরণ করা দরকার। এই পাখিগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি আরও জানান, অতিথি পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে কৃত্রিম সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে মারা যাচ্ছে অতিথি পাখিরা। বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী পরিযায়ী (অতিথি পাখি) পাখি হত্যার দায়ে অপরাধীকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি যদি পরিযায়ী পাখির মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করে, দখলে রাখে কিংবা ক্রয়-বিক্রয় করে বা পরিবহন করে, সে ক্ষেত্রে তার সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আইন প্রচলিত রয়েছে। অতিথি পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁকে এক শ্রেণির পেশাদার এবং শিকারি কাজগুলো করে চলেছে। সাচিলাপুর এলাকার রাকিব হোসেন জানান, প্রতিবছরই শীত মৌসুমে আমাদের এখানে অতিথি পাখির আগমন ঘটে। নদীর চরে বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে হোগল বন রয়েছে। সেখানেই পাখিদের আশ্রয়স্থল। তারা সাধারণত সকালে এবং পড়ন্ত বিকালে ঝাক বেঁধে উড়ে বেড়ায়। অন্যান্য সময় খাবারের খোজে এবং বিশ্রামে থাকে। নৌ-যানের শব্দ বা কেউ ওদের কোনোভাবে বিরক্ত করলে তখন আবার উড়তে শুরু করে। ওদের দল বেঁধে উড়া একেক সময় একেকটা শৈল্পিক রূপ দেখা যায়।
তিনি আরও জানান, আগে শিকারিরা বন্ধুক নিয়ে পাখি শিকারে আসত। তখন তাদের নিষেধ করলে অনেক সময় তর্ক-বিতর্কও হতো। তোপের মুখে পাখি শিকার না করেই তারা ফিরে যেত। এভাবে কয়েকবছর অতিথি পাখি রক্ষায় তৎপর থাকায় এখন আর কেউ পাখি শিকারে আসে না। বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসাম্মাৎ জেবুন্নেছা জানান, পাখিদের বাসস্থান সংকট, বিষটোপ ব্যবহার করে খাদ্য সংকট, জীবন বিপন্ন করা, শিকার, পাচারসহ ইত্যাদি কারণে আশঙ্কাজনক হারে আমাদের দেশে শীতে পাখি আসার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে।
তবে আমরা সচেতন না হলে আইন প্রয়োগে খুব একটা সফলতা পাওয়া যাবে না। প্রশাসনের সঙ্গে আমাদেরও সহযোগিতা করতে হবে। ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, অতিথি পাখি আমাদের সম্পদ। তাদের রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। ওরা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কেউ যদি পাখিদের অভয়াশ্রমে বিরক্ত করে বা কোন শিকারি যদি সেখানে গিয়ে পাখি শিকার করতে চায়, তখন আমাদের জানালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
