সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

শীত এলেই টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় প্রকৃতি যেন নতুন রূপে ধরা দেয়। দিগন্তজোড়া সরিষা ফুলের সোনালি আভা, তার সঙ্গে বাতাসে ভেসে বেড়ানো মিষ্টি ঘ্রাণ আর মৌমাছির অবিরাম গুঞ্জনে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার মাঠ-প্রান্তর। এই সৌন্দর্যের আড়ালেই এখন গড়ে উঠছে খাঁটি মধুর এক সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত, যা বদলে দিচ্ছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। সরিষা খেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো শত শত আধুনিক মৌ-বাক্সে উৎপাদিত হচ্ছে বিশুদ্ধ সরিষা ফুলের মধু। এই মধু শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়- দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ঘাটাইল উপজেলায় বর্তমানে স্থানীয়ভাবে ৪ থেকে ৫ জন মৌচাষি স্থায়ীভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তবে সরিষা মৌসুম শুরু হলেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ জন অভিজ্ঞ মৌচাষি এখানে এসে অস্থায়ীভাবে মৌ-বাক্স স্থাপন করেন। চলতি মৌসুমে সম্মিলিতভাবে তাদের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ থেকে ৫০ টন খাঁটি মধু সংগ্রহ। সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ সরিষা খেতের পাশে পরিকল্পিতভাবে সারি সারি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি বাক্সে রয়েছে একটি করে রাণী মৌমাছি। তার নেতৃত্বেই হাজারো শ্রমিক মৌমাছি সরিষা ফুল থেকে রেণু সংগ্রহ করে তৈরি করছে খাঁটি মধু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ রাণী মৌমাছি দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার পর্যন্ত ডিম দিতে সক্ষম, যা একটি শক্তিশালী মৌকলোনি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘাটাইলে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত মৌমাছির মধ্যে ইতালিয়ান জাতের এপিস মেলিফেরা লিগুস্টিকা বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এই জাতের মৌমাছি শান্ত স্বভাবের, উচ্চ মধু উৎপাদনক্ষম এবং পরাগায়নে অত্যন্ত দক্ষ। শ্রমিক মৌমাছির পেটের অংশ হালকা হলুদ বা কমলা রঙের হওয়ায় সহজেই চেনা যায়। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক মৌচাষে এই জাতকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মধু চাষি সজিব তালুকদার জানান, তিনি টানা চার বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে মৌচাষ করছেন। তার মালিকানায় বর্তমানে ১৫০টি আধুনিক মৌবাক্স রয়েছে, যা সরিষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভাগ করে স্থাপন করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে তার লক্ষ্য প্রায় ১ টন খাঁটি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ।
তিনি বলেন, সরিষা ফুলের মধু স্বাদ ও গুণগত মানে আলাদা হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি। পাশাপাশি মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষা খেতের ফলনও বাড়ে, এতে কৃষক ও মৌচাষি- দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছেন। ন্যাশনাল এপিকালচার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর সভাপতি আবু হানিফ খান বলেন, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার মৌচাষি রয়েছেন।
বাংলাদেশের বার্ষিক মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার টন। সরিষা, ধনিয়া, কালোজিরা, লিচু ও সুন্দরবনের মধু সবচেয়ে জনপ্রিয়। বছরে প্রায় ছয় মাস মধু সংগ্রহ করা হয়, এর মধ্যে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের সময়কাল প্রায় দুই মাস।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রণোদনা ও আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ঘাটাইল উপজেলা সরিষা ফুলের খাঁটি মধু উৎপাদনের একটি জাতীয় পর্যায়ের মডেল কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সরিষা ফুলের হলুদ মাঠ আর মৌমাছির গুঞ্জনে ঘাটাইলের গ্রামাঞ্চল এখন আর শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের ছবি নয়; এটি হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় এক নতুন গ্রামীণ অর্থনীতির জীবন্ত প্রতীক।
