ধানি জমি কেটে ফিশারি খনন কমছে ফসল উৎপাদন
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠ এখন ছোট-বড় অসংখ্য জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে এখানে কৃষি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে এবং সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মাছের খামার। কিন্তু এই পরিবর্তনের মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে উৎপাদন খরচের বোঝা, জলাবদ্ধতা আর কৃষি খাতের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
চান্দিনার কৃষকদের কণ্ঠে ঝরছে ধান চাষ নিয়ে চরম হতাশা। কৃষকরা জানান, বর্তমানে কৃষি জমিতে ধানের চাষ করতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, ফসল ফলানোর পরে সেই জমির ধান বিক্রি করে তার অর্ধেক টাকাও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
সার, বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় ধানের দাম বাড়েনি। ফসল উৎপাদনে যথেষ্ট শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ চাষিরা। তাদের মতে, হাড়ভাঙা খাটুনি আর মোটা অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করে যখন লোকসানের বোঝা টানতে হয়, তখন কৃষক বিকল্প পথের সন্ধানে নামেন।
তাই অধিক লাভের আশায় জমি খনন করে কৃত্রিম জলাশয়ে মাছের খামার করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন অনেকেই। যারা নিজে চাষ করতে পারছেন না, তারা জমি লিজ দিচ্ছেন বড় মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে। এতে করে তারা ঘরে বসেই এককালীন মোটা অংকের টাকা পাচ্ছেন, যা দিয়ে সংসার চালানো বা অন্য ঋণের বোঝা মেটানো সহজ হচ্ছে।
তবে এই হুজুগে পুকুর খননের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ ও অন্যান্য কৃষকদের ওপর। নির্বিচারে তিন ফসলি জমিতে পুকুর কাটার ফলে গ্রামীণ জনপদে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সরতে না পেরে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা।
ফলে যারা এখনো ধান চাষ ধরে রাখতে চান, তাদের ফসল পানির নিচে তলিয়ে পচে যাচ্ছে। এই জলাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। এক কৃষকের তৈরি করা পুকুরের পাড় অন্য কৃষকের জমির আইল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী জমিতে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, যা ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পাশের জমির মালিকও তখন তার জমিতে পুকুর খনন করতে বাধ্য হন। কৃষি জমি কমার পেছনে শুধু মাছ চাষই একমাত্র কারণ নয়। স্থানীয়রা জানান, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে আবাসন সংকট মেটাতে কৃষি জমিতে গড়ে উঠছে নতুন নতুন বাড়িঘর।
প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি বসতভিটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে গ্রামীণ মানুষের আর্থিক অনটনের তীব্র কশাঘাত। অভাবের তাড়নায় অনেক প্রান্তিক কৃষক তাদের শেষ সম্বল জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এতে জমির উর্বরতা শক্তি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। একবার মাটি সরিয়ে ফেললে সেই জমিতে ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যার ফলে কৃষক বাধ্য হয়েই সেই জমিকে জলাশয়ে রূপান্তর করছেন অথবা মাছ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। চান্দিনার এই চিত্র স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও মাছ চাষে সাময়িকভাবে কৃষকের হাতে নগদ টাকা আসছে এবং মৎস্য উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য ধান বা রবি শস্যের চাষাবাদ যদি এভাবে কমতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যশস্যের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। কৃষি জমি রক্ষা এবং পরিকল্পিত মৎস্য চাষের মধ্যে সঠিক সমন্বয় করা এখন সময়ের দাবি। কৃষকদের অভিমত, যদি ফসল উৎপাদনের খরচ কমানো যেত এবং ধান বিক্রিতে লাভ নিশ্চিত হতো, তবে তারা হয়তো বাপ-দাদার আমলের পেশা ছেড়ে মাছের খামাওে ঝুঁকতেন না। ফসলি জমি রক্ষা করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে চান্দিনার মানচিত্র থেকে চিরচেনা সোনালি ফসলের মাঠগুলো হয়তো শুধু স্মৃতি হয়েই থাকবে।
চান্দিনা বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি রক্ষার জন্য চান্দিনা উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাটি খনন করার কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন জায়গায় অনেক ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করে হয়েছে। চান্দিনা উপজেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন এলাকার ড্রেজার মেশিন ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, যাতে কোথাও কৃষি জমি খনন করা না হয়। ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাছের প্রজেক্ট খনন করার কারণে একদিকে প্রজেক্টর কারণে সরকারি রাস্তা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে মৎস্য প্রজেক্টর গভীরতার কারণে পাশের কৃষকের কৃষি জমি ভেঙে মৎস্য খামারে চলে যাচ্ছে।
