প্রবাসীদের আয়ে বদলে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জের আর্থসামাজিক চিত্র

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

মুন্সীগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) কার্তিক চন্দ্র দেনাথ বলেছেন, মুন্সীগঞ্জের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সবচেয়ে বড়। রেমিট্যান্স শুধু পরিবার নয়, পুরো জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রভাব ফেলছে। মুন্সীগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বেশি প্রবাসী কর্মী পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত সৌদি আরবে মুন্সীগঞ্জ থেকে মোট ৯৯ হাজার ৩৮ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধা কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৮৮ হাজার ৯৭৩ জন, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য বলছে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮১৩ জন মুন্সীগঞ্জবাসী প্রবাসে গেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৭ জন এবং নারী ২৪ হাজার ৯৭৬ জন। শুধু গত পাঁচ বছরেই শ্রম ভিসায় বিদেশে গেছেন সোয়া লাখের বেশি মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে মুন্সীগঞ্জের প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, এই রেমিট্যান্স সঠিক পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করা গেলে মুন্সীগঞ্জের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত পাবে।

কৃষি প্রধান জেলা থেকে প্রবাসীনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের এই গল্প এখন মুন্সীগঞ্জের বাস্তবতা। প্রবাসী কর্মীর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার মোট ৮৪ হাজার ৩৮৭ জন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৮৪ হাজার ৩১৪ জন ও নারী ৭৩ জন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতে মুন্সীগঞ্জের মোট ৪২ হাজার ২৪৫ জন প্রবাসী রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩৮ হাজার ৪৯ জন ও নারী ৪ হাজার ১৯৬ জন। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটিতে মুন্সীগঞ্জের ৩৮ হাজার ১০ জন কর্মী অবস্থান করছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৭হাজার ৯৬১ জন এবং নারী ৪৯ জন। পঞ্চম স্থানে কাতারে পাড়ি জমিয়েছেন ১৯ হাজার ১৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৯৭৮ জন ও নারী ১ হাজার ২০৯ জন। ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে কুয়েত। সেখানে মুন্সীগঞ্জের মোট ১৯ হাজার ৯১ জন প্রবাসী কর্মরত আছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১৮ হাজার ৮১৯ জন ও নারী ২৭২ জন। সপ্তম অবস্থানে ওমানে মুন্সীগঞ্জের প্রবাসীর সংখ্যা ১১ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ হাজার ২৬০ জন ও নারী ২ হাজার ১৮৮ জন। অষ্টম অবস্থানে থাকা বাহরাইনে পাড়ি জমিয়েছেন ৬ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ হাজার ২১৯ জন ও নারী ১৩১ জন। নবম অবস্থানে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে মুন্সীগঞ্জের মোট ৫ হাজার ৮৪৮ জন প্রবাসী রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ হাজার ৮২৪ জন ও নারী ২৪ জন। শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় দশম অবস্থানে ব্রুনাই। সেখানে মুন্সীগঞ্জ জেলার ৩ হাজার ৯৩৮ জন প্রবাসী কর্মরত আছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ৯৩৩ জন ও নারী ৫ জন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব দেশে কর্মরত প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স মুন্সীগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা গেলে এই অবদান আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই আয়েই বদলে যাচ্ছে জেলার আর্থসামাজিক চিত্র। এক সময় পদ্মা পাড়ের গ্রামগুলোতে টিনের ঘরই ছিল বাস্তবতা, এখন সেখানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, ছোট কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বাসিন্দা প্রবাসীর বাবা আবদুল মান্নান বলেন, ছেলে সৌদিতে কাজ করে। তার পাঠানো টাকায় ঘর করেছি, জমি কিনেছি। আগে দিন চলত কষ্টে, এখন অন্তত চিন্তা কম। নারীরাও পিছিয়ে নেই বছরেই, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, বিদেশে কর্মসংস্থানে গেছেন ২৯ হাজার ৭০৬ জন, যার মধ্যে নারী ১ হাজার ৯৩ জন। মুন্সীগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রাবেয়া আক্তার বলেন, আমার বোন সিঙ্গাপুরে কাজ করে। পরিবারে মেয়েদের কাজ করা নিয়ে আগে অনেক কথা ছিল। এখন সবাই বোঝে, নারীর আয়েও সংসার বদলাতে পারে। অর্থনীতির ভরসা প্রবাসীরাব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, এই রেমিট্যান্স সঠিক পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করা গেলে মুন্সীগঞ্জের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত পাবে। কৃষি প্রধান জেলা থেকে প্রবাসীনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের এই গল্প এখন মুন্সীগঞ্জের বাস্তবতা।