বাঁশপণ্যের কারিগররা ভালো নেই

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আব্বাস আলী, নওগাঁ

প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের কারণে নওগাঁয় দিন দিন বাঁশের তৈরি পণ্যের কদর কমেছে। আর এরসঙ্গে জড়িত কারিগরদের চাহিদা ও আয় কম যাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। ক্ষুদ্র হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছে এর সঙ্গে জড়িত কারিগররা। বাঁশ পণ্যের বাজার বাড়লেও স্থানীয় পর্যায়ে প্লাস্টিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এছাড়া কারিগররা সহায়তা না পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প বিলুপ্তির পথে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা। গ্রামীণ জীবনে মানুষ গৃহস্থালি, কৃষি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বাঁশের তৈরি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করত। গ্রামীন জীবনে এখনও বাঁশের পণ্যের ব্যবহার থাকলেও, তবে তা আগের মতো ব্যাপক নয়। বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর তৈরি বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তি। সময়ের ব্যবধানে আধুনিক জীবনধারায় স্থান দখল করেছে প্লাস্টিক পণ্য। এতে দিন দিন বাঁশ পণ্যের চাহিদা কমে আসায় উৎপাদন কমেছে।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ দাশপাড়া গ্রাম। এ গ্রামের ৪০টি পরিবারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০ জনের বসবাস। এরমধ্যে প্রায় ১৫০ জন বাঁশ পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত। বাঁশের তৈরি বাচ্চাদের দোলনা, পাখা, কুলা, চালুনিসহ বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। তবে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের দাম দিনদিন বাড়ছে। আবার প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের প্রতিযোগীতায় টিকতে পারছে না। এতে বাঁশের তৈরি পণ্যের কদর কমেছে। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের ভাগ্যে নেমে এসেছে দুর্দিন। কাজ কমে আসায় তারপরও সপ্তাহে এ পাড়া থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।

বয়োজ্যেষ্ঠ বাঁশ পণ্যের কারিগর অতিন কুমার বলেন- বয়স যখন ১০-১২ তখন থেকে বাপ-দাদার কাছ থেকে বাঁশ পণ্য তৈরি হাতেখড়ি। বছর কয়েক আগেও বাঁশ পণ্যের ব্যাপক কদর ছিল। কাজের চাপ থাকায় আয়ও ভালো হতো। তবে বর্তমানে প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের কারণে আয়ে ভাটা পড়েছে। পুরো সপ্তাহজুড়ে কাজ করে খরচ বাদে আয় হয় প্রায় দেড় হাজার টাকা। এতে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। কোনো মতে পেটে ভাতে দিন পার হয়ে যাচ্ছে।

কারিগর অখিল দাস বলেন- ২৫ বছর থেকে বাঁশ তৈরি করা হচ্ছে। গত ৫ বছর আগেও জমজমাট ছিল। প্লাস্টিক আসার পর থেকে বাঁশ পণ্যের কদর কমতে শুরু করেছে। তারপরও কুলা, ঝাড়ু ও টোপার এখনও কদর আছে। এগুলো প্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে না। গত ৩ বছরের ব্যবধানে প্রতিটি বাঁশের দাম ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৫০০ টাকার বাঁশ কিনে সপ্তাহে প্রায় ৪ হাজার টাকার বিভিন্ন বাঁশ পণ্য তৈরি হয়।

পাইকারিতে প্রতিপিস কুলা ৬০ টাকা, চালুনি ৫০ টাকা ও খৈ-চালা ৫০-১৫০ টাকা বিক্রি হয়। কারিগর গৃহবধূ রত্না বলেন- বছরে ৯ মাস কাজ করা হয়।

বর্ষায় তিনমাস কাজ বন্ধ থাকে। সেসময় আমাদের ধারদেনা করে সংসার চলে। আর শীত মৌসুমে কাজের একটু চাপ থাকে। বিভিন্ন এলাকায় মেলা হলে বাঁশ পণ্যের চাহিদা থাকায় কাজের চাপও বাড়ে। বাঁশপণ্যগুলো পাইকারি বিক্রি করা হয়। কারিগর গৌতম দাস বলেন- বাপ-দাদার পেশা। এটা ছাড়া আমরা অন্য কোনো কাজ করতে পারি না। মানুষ একবেলা পরিশ্রম করে ৫০০-৭০০ টাকা আয় করছে। আর আমরা পুরো সপ্তাহে কাজ করে দেড় হাজার টাকা আয় হয়। যা দিয়ে কোনো রকম কষ্ট করে দিন যাচ্ছে। তবে এখন পেশা পরিবর্তনের সময় এসেছে। এটা দিয়ে আর সংসার চলবে না। কারিগর মানিক চন্দ্র দাস বলেন- একটি বাঁশের দাম যখন ৫০ টাকা ছিল তখন বাঁশ পণ্য বিক্রি হয়েছে ৩০-৪০ টাকা।

এখন বাঁশের দাম বেড়েছে আর জিনিসের দাম কমেছে। বাঁশ পণ্যের এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। বাঁশ পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়তে হয়েছে। অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিয়ে বিকল্প পেশা খুঁজছে। নওগাঁ বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন বলেন- সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে প্লাস্টিক জিনিসপত্রের ব্যবহার বেড়েছে। তবে বাঁশ পণ্য পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় পুনরায় এর ব্যবহার বাড়িয়ে ঐতিহ্য ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। একসময় গৃহস্থালিতে প্রচুর ব্যবহার হতো বাঁশপণ্য। তিনি বলেন- সম্ভবনাময় এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে বিসিকে পক্ষ থেকে পণ্য বিপণনসহ কারিগরি প্রশিক্ষণসহ সবধরনের সহযোগিতা করা হবে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধা হতে পারে।