পিরের নির্দেশে ৫৬ বছর ধরে ভোট দেন না রূপসা ইউনিয়নের নারীরা
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চাঁদপুর প্রতিনিধি
ভারতের ঐতিহাসিক জৈনপুরী পীরের নসিহতে স্বাধীনতা পূর্বে ১৯৬৯ সাল থেকে নির্বাচনে সরাসরি ভোটবিমূখ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা ইউনিয়নের নারীরা। ওই এলাকায় মহামারি দেখা দিলে এমন নির্দেশনা দেন ওই পীর। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ভোটমুখী করার জন্য চেষ্টা করা হলেও কার্যকর ভূমিকার অভাবে এখনও ভোটবিমূখ নারীরা। ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রবীণ নারী-পুরুষদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেলে এসব তথ্য। তবে জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাশা বিগত বছরের তুলনায় এবছর নারী ভোটারের সংখ্যা বাড়বে। ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ি ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে জনসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। ভোটার সংখ্যা ২১ হাজার ৬৯৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১০ হাজার ৫৯৯ এবং পুরুষ ১১ হাজার ৩৯৬ জন।
ইউনিয়নের প্রধান কেন্দ্র গৃদকালিন্দিয়া বাজার, কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে ঘুরে দেখাগেছে নারীদের বিচরণ। পর্দায় থেকে সব নারীরাই তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করছেন। ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে আসছেন নারীরা। ইউনিয়নের চর মান্দারি গ্রামের জমাদার বাড়ির ৮০ বছরের বৃদ্ধ শফিউল্যাহ বলেন, ১৯৬৯ সালে এই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কলেরা মহামারি দেখা দেয়। তৎকালীন সময়ে ভারতের ঐতিহাসিক জৈনপুরী দরবারের পীর এই এলাকায় সফরে ছিলেন। তখন লোকজন তার কাছে গেলে নারীদের পর্দায় থাকার নসিহত করেন তিনি। তখন থেকেই নারীরা পর্দার খেলাপ হওয়ার ভয়ে ভোটে অংশগ্রহণ করছেন না। ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা প্রবীণ বেশ কয়েকজন নারী জানান, আমাদের ইউনিয়নে মহিলাদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে হুজুর নিষেধ করছেন। এই জন্য উনার নিদের্শনা মেনে চলছি। চর মান্দারি গ্রামের সুলতান খান (ক্বারী) বাড়ির সুফিয়া বেগম বলেন, গত প্রায় ৪০ বছর আগে কয়েক গ্রামের কিছু নারী ভোট দেয়। কিন্তু তারা পীরের নিদের্শনা অমান্য করায় তাদের কয়েকজনের নানা রোগ ও অঙ্গহানির মত অসুস্থ্যতা দেখা দেয়। ভয়ে এরপর থেকে আর কেউ ভোট দেয়নি।
একই বাড়ির আরও দুইজন প্রবীণ নারী বলেন, পীরের নসিহতে আমরা ভোট দেই না। কিন্তু ভোট দেওয়ার জন্য আমাদেরকে কেউ এসে বলেও না। এবার অন্য নারীরা ভোট দিলে আমরাও দিব।
ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য সাজেদা আক্তার বলেন, তিনি ৯০ দশকে কোনো এক নির্বাচনে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে গেলে হুজুরের নির্দেশনা মনে পড়ে। তাৎক্ষনিক তিনি নিজে ভোট না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পছন্দের প্রতীক বলে ভোট সম্পন্ন করান। এরপর থেকে তিনি নিজেই ভোট দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, আমি নারীদের বলছি ভোট আপনার অধিকার। অব্যশই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিবেন। পর্দা পালন করেই ভোট দিতে পারবেন। ওই ধরনের ব্যবস্থা আছে। ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, জৈনপুরী হুজুর পর্দায় থাকার জন্য বলেছেন। ভোট দেওয়া কিংবা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো নির্দেশনা দেননি। এবছর আমরা চেষ্টা করছি নারীদের ভোটমূখী করার জন্য। ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির বলেন, হুজুরের অসিহতের পর থেকে এখানে নারীরা ভোট দেন না। তবে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা ভোট দিবেন বলে আশ্বস্ত করছেন। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ বলেন, এখানে নামমাত্র কিছু নারী ভোট দেন। এই সংখ্যা যেন আরও বাড়ে সে বিষয়ে আমাদের চেষ্টা চলছে।
