জগদল জমিদারবাড়ি সংরক্ষণের দাবি

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নাজমুল হোসেন, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের জগদল গ্রাম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা এই নীরব জনপদে দাঁড়িয়ে আছে এক হারানো সময়ের সাক্ষী, রাজা শ্রী বীরেন্দ্রনাথের জগদল জমিদারবাড়ি। রাণীশংকৈল উপজেলা শহর থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে এই স্থাপনা এখনও অতীত ঐশ্বর্যের আভাস দেয়, যদিও বাস্তবে এটি আজ পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উপজেলা শহর থেকে চার্জার ভ্যান বা অটোতে নেকমরদ চৌরাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানো যায় মাত্র ১৫-২০ টাকায়। সেখান থেকে আবার অটো বা রিজার্ভ ভ্যানে নেকমরদ কলেজ রোড হয়ে জগদল জমিদারবাড়ির পথ। পথের কোলঘেঁষে সবুজ ধানখেত, নদীর শব্দ, আর সীমান্তের নিস্তব্ধতা যেন ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো গল্পের ভূমিকা রচনা করে। নদীমোহনা ও আশপাশের ঐতিহ্য- জগদল গ্রামে রয়েছে তীরনই ও নাগর নদীর মিলনস্থল, স্থানীয়দের কাছে যাকে দুই নদীর ‘মোহনা’ বলা হয়। বাংলাদেশের খুব কম জায়গায় এ ধরনের দ্বৈত নদীর মিলন দেখা যায়। জমিদারবাড়ির পাশেই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প ও প্রাচীন কালীমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যেগুলো পুরো এলাকাটিকে আরও ঐতিহ্যমণ্ডিত করেছে।

ইতিহাসের সাক্ষী তবু পরিত্যক্ত স্থাপনা- জমিদারবাড়ির ভগ্নদশা চোখে পড়ার মতো। স্থাপনাগুলো ঘিরে রয়েছে লতাগুল্ম ও বড় বড় বৃক্ষ। বসতঘর, মন্দির, সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশ তোরণ-সবই এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তবে সময়ের ক্ষয়ে প্রতিটি কাঠামোই ঝুঁকিতে। ইট, চুন, কাঠ ও লোহার বর্গা দিয়ে নির্মিত এই ভবনগুলোর স্থাপত্যে রয়েছে তুস্কান স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও সমতল ছাদের ব্যবহার- যা উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের জমিদার স্থাপত্যের নিদর্শন। বাড়ির পশ্চিমে নদীর কিনারে ছিল একটি মন্দির, যা এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ। স্থানীয়দের বেদনাময় স্মৃতিতে এখনও জেগে আছে সেই মন্দিরের গৌরবময় অতীত।

রাজকুমার বীরেন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্যপ্রেম- জগদলের রাজকুমার শ্রী বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বইপ্রেমী। তার বিয়ের সম্পর্ক যুক্ত হয় ভারতের বাকীপুরের জমিদার রায় পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহের পরিবারের সঙ্গে। বীরেন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছিলেন সমৃদ্ধ পাঠাগার, যা পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে দান করা হয় তৎকালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজ- বর্তমান দিনাজপুর সরকারি কলেজে। সেই সময় দানকৃত বইগুলোর মূল্যমান ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা-যা তখনকার সময়ে একটি বিশাল অঙ্ক।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি- জনশ্রুতি রয়েছে, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার ছেলেবেলার কিছু সময় এখানে কাটিয়েছিলেন। তার স্মৃতি রক্ষার্থে ২০১৪ সালে নির্মিত ‘হুমায়ূন মঞ্চ’ আজ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে- পদে পদে ধ্বংসের ইঙ্গিত।

গেজেট হলেও নেই কার্যকর উদ্যোগ- ২০২২ সালে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভর করা রিটের ফলস্বরূপ ২০২৪ সালে জমিদারবাড়িটি গেজেটেড হয়। কিন্তু গেজেট হলেও এখনও কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়নি। তাই প্রতিটি বর্ষায় বাড়িটির আরও কিছু অংশ ভেঙে পড়ছে, আর ইতিহাসের এই গৌরবময় সাক্ষী ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

নদী ভিউ পয়েন্ট ও সীমান্তের আলো- জমিদারবাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে নাগর নদী ভিউ পয়েন্ট। বিকালের আলো, নদীর ঢেউ, আর সীমান্ত পিলারের আলোর ঝলকানি মিলিয়ে জায়গাটি এখন স্থানীয়দের প্রিয় আড্ডাস্থল। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করেন। কিন্তু জমিদারবাড়ির দিকে তেমন নজর নেই কারও। সংরক্ষণে স্থানীয়দের দাবি- রাণীশংকৈল উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের দাবি, এই জমিদারবাড়িকে সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য যেন সরকার জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়। নইলে কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি খুব শিগগিরই চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। জগদল জমিদারবাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি একটি জনপদের ইতিহাস, স্থাপত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। সময় থাকতে যদি এর সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হতে পারে- যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। মেহেদী হাসান শুভ বলেন- আমরা আশা করছি পুরোনো এই জমিদার বাড়িটি আগে রুপ ফিরে পাবে এবং এই স্থানটিকে দর্শনীয় করে তুলতে সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই। তবে স্থানীয় অনেকে বলছেন, সরকার চাইলে এই পুরোনো জমিদার বাড়িটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে এবং এখান থেকে বাৎসরিক সরকারের একটি রাজস্ব আদায় হবে।