মাদকমুক্ত ও সৎ জীবনযাপনে উৎসাহিত করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ফারুক হোসেন আপন, বড়াইগ্রাম (নাটোর)

মুখ ভর্তি কাঁচা-পাকা দাঁড়ি, মাথায় টুপি পড়া একজন বৃদ্ধ মানুষ। এক হাতে নানা স্লোগান লেখা ব্যানার আর অন্য হাতে হ্যান্ড মাইকে নিয়ে মহাসড়কের ধারে বা রোড ডিভাইডারের উপর দাঁড়িয়ে অনর্গল বলছেন, ‘মাদক নেশা বন্ধ করুন, যুব সমাজকে রক্ষা করুন, সততা মহৎ গুণ, সৎভাবে জীবনযাপন করুন। প্রতিদিনই এমন দৃশ্যের দেখা মেলে নাটোরের বড়াইগ্রাম ও বনপাড়া পৌরসভাসহ পাশের গুরুদাসপুরের বিভিন্ন রাস্তায় রাস্তায়।

এভাবে নিঃস্বার্থভাবে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালান ব্যক্তির নাম প্রকৌশলী আমিন উল্লাহ (৭১)। তিনি পিডিবির অবসরপ্রাপ্ত একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। অবসরকালে বিলাসবহুল বিশ্রামের জীবন ছেড়ে এ মানুষটি ঘুরছেন পথে পথে।

এক হাতে হ্যান্ড মাইক, অন্য হাতে ব্যানার নিয়ে নেমে পড়েছেন সচেতনতামূলক প্রচারণায়। কখনও মাদকবিরোধী প্রচারণা, কখনও বা দুর্নীতি, যৌতুক, সুদ, ঘুষ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ব্যানারে লেখা থাকে ঘুষ দেওয়া আর নেওয়া সমান অপরাধ, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকুন, অবৈধ সম্পদে বরকত নেই, বৈধভাবে আয় করুন। আবার কোনো কোনো পোস্টারে লেখা রয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে যাবেন না ইত্যাদি। নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যা অবধি এমন প্রচারণা চালান তিনি। একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারণায় ছুটে বেড়ান পথে-প্রান্তরে, হাট-বাজারে। বিগত বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনার সময়ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করেছেন তিনি।

জানা যায়, ২০১২ সালে অবসর নেওয়ার পর থেকে তিনি এভাবেই ব্যস্ত সময় কাটান। তার বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মেরিগাছা গ্রামে। বর্তমানে তিনি বসবাস করেন উপজেলার বনপাড়া পৌরসভার সরদারপাড়া মহল্লায়। পেনশনের টাকা থেকেই তিনি হ্যান্ডমাইকসহ বিভিন্ন রকমের ব্যানার তৈরি করেছেন। বিভিন্ন হাটবাজারে যাওয়ার যানবাহন খরচ ও খাবার খরচও তিনি নিজের পেনশনের টাকা থেকেই বহন করেন। সরকারি-বেসরকারি কোনো সংগঠন তাকে কোনো সম্মাননা না দিলেও জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার হয়েছে। এতে তিনি কাজে আরও উৎসাহিত হয়েছেন বলে জানান।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, প্রায়ই বনপাড়া বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন রাস্তায় মানুষটিকে দেখি। যে বয়সে তার ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটানোর কথা, সে সময় তিনি সারাদিন মানুষকে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি থেকে দুরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে, মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করছেন। তার এমন নিঃস্বার্থ সমাজসেবা প্রশংসার দাবি রাখে।

বনপাড়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মানুষ দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। এলাকার যুব সমাজ তথা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক সেবনের হার বেড়ে গেছে। যদিও একজন মানুষের প্রচারণায় সবাই মাদক থেকে দূরে সরে আসবে না, তারপরও একজন বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা যেভাবে পথে পথে ঘুরে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন, এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

এ ব্যাপারে প্রকৌশলী আমিন উল্লাহ বলেন, মাদকের ছোবলে তরুণরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানরা নামাজ-রোজা থেকে সরে গিয়ে সুদণ্ডঘুষসহ নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই অবসরে এসে বসে না থেকে এসব অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছি। দেশের প্রতি নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে যতটুকু সম্ভব আমি চেষ্টা করছি। এ প্রচেষ্টাকে অনেকেই স্বাগত জানালেও কেউ কেউ উপহাসও করতেও ছাড়েন না। তবে যতদিন বেঁচে থাকব, মাদক-দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ লড়াই চালিয়ে যাব ইনশাল্লাহ। এতে যদি কিছু মানুষও সৎপথে আসে, তাতেই আমার পরিশ্রম সার্থক।

ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তিনি যেভাবে নিংস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এটা সত্যিই বিরল। এমন মহৎ উদ্যোগে সবাই তার পাশে থাকা উচিত। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।