রংপুরে দ্রব্যমূল্যে নাগরিক জীবনে অস্বস্তি
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আব্দুর রহমান মিন্টু, রংপুর
রংপুর নগরীর লালবাগ, শাপলা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় কিংবা পায়রাচত্বর বাজার যেদিকেই তাকানো যায়, ক্রেতাদের চোখেমূখে একই প্রশ্ন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কি আর কমবে না?’ চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি ও মাছ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভরা মৌসুমেও সবজির দাম বেশি হওয়ায় মানুষের মাঝে অশান্তি বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে রংপুরের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই নিত্যপণ্যের দাম যেন সহনীয় থাকে, আর খাবার যেন নিরাপদ হয়। এই চাওয়া পূরণে কার্যকর উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে রংপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজির উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, শিম ও মুলাসহ বিভিন্ন সবজি বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, তবে পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক পর্যায়ে লাভ পৌঁছাচ্ছে না।
এ ঘটনায় রংপুর সদর, তারাগঞ্জ ও গঙ্গাচড়াসহ উপজেলার অধিকাংশ কৃষকই উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। গঙ্গাচড়ার কৃষক আবদুল করিম জানান, এ বছর ফলন ভালো হলেও হাটে টমেটো বিক্রি করতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকায়। অথচ বাজারে গিয়ে দেখি সেই টমেটোই ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার মতে, পরিবহন ও সার বীজের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত লাভ শূন্যের কোঠায়।
পীরগঞ্জ উপজেলার সবজি চাষি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে শিম ও বাঁধাকপি চাষ করতে এবার প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু হাটে শিম বিক্রি করেছি কেজিপ্রতি ১২-১৪ টাকায়, বাঁধাকপি পেয়েছি ৬-৭ টাকা। এতে লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় খরচই ওঠে না। তিনি অভিযোগ করেন, আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কৃষক নিজের পণ্যের দাম নিজে ঠিক করতে পারছেন না। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে শীতকালীন সবজি আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সরাসরি কৃষক ভোক্তা সংযোগ বাড়ানো গেলে এই সংকট কমবে। এদিকে বাজারে সবজির দাম বেশি হওয়ায় বিপাকে রংপুরবাসী নগরীর শালবন বাজারে সবজি কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা বেগম বলেন, আগে ২০০ টাকায় বাজার শেষ হতো, এখন ভরা মৌসুমেও ৫০০ টাকা দিয়েও বাজার শেষ করা যাচ্ছে না। তার ওপর কোনটা ভেজাল, কোনটা ভালো বোঝাও দায়। লালবাগের একজন ক্রেতা টিটু মিয়া বলছেন, ভরা মৌসুমেও যদি সবজি এতো বেশি দামে কিনতে হয় তবে অন্য সময় কি রকম দাম হতে পারে ধারণা করেন। এ সময় সবজির মূল্যে খুবই কম থাকে।রংপুরের একজন পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী জানান, খামার থেকে বাজারে পণ্য আসছে। পরিবহন খরচ বেড়েছে, বর্ষায় অনেক পণ্য নষ্টও হয়। যোগান ঠিক না থাকলে দাম কমানো সম্ভব না।
রংপুর টাউন বাজারের এক সবজি বিক্রেতা বলেন, পাইকারি বাজারে দাম কম থাকলেও আড়তদার ও পরিবহন খরচ যোগ হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম বাড়ে। তবে ভোক্তারা বলছেন, বাজারে দাম কমার সুফল তারা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত্রে এই সংকট বেশি দেখা যাচ্ছে। কৃষিপ্রধান জেলা হয়েও সংরক্ষণ ও আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থার ঘাটতি রংপুর অঞ্চলের বড় সমস্যা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভেজাল খাবারের ঝুঁকি। নগরীর কয়েকটি বাজারে খোলা তেল, মসলা ও ফল সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক রেজাউল করীম বলেন, ‘ভেজাল খাবারের কারণে গ্যাস্ট্রিক, লিভার ও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।’ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রংপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মমতাজ বেগম জানান, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবে জনবল ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সব বাজারে একসঙ্গে নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা দু’পক্ষকেই সচেতন হতে হবে, না হলে শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রংপুরে সূধী সমাজের মতে, রংপুর অঞ্চলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে ভেজাল বিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং না হলে দ্রব্যমূল্য ও খাদ্য নিরাপত্তা দুই সংকটই আরও গভীর হবে। তারা আরও বলেন, কৃষিপণ্যের বাজারে শক্তিশালী মনিটরিং, কৃষক বাজার চালু এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণে না আনলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কৃষকের হাতে পৌঁছাবে না। ফলে কৃষকের আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
