চান্দিনায় সবজি চাষে বিপ্লব

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

চান্দিনার কামারখোলা গ্রামের মাঠ এখন সবুজের সমারোহে ভরে উঠেছে। বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে আলুর পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়ার এই মেলবন্ধন শুধু নান্দনিক নয়, বরং অর্থনৈতিক সাফল্যের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। এই অসাধারণ সাফল্যের কারিগর স্থানীয় পরিশ্রমী কৃষক মাসুম বিল্লাল। তিনি তার মাত্র ৩৩ শতাংশ জমিতে আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে বাজিমাত করেছেন। সাথী ফসল হিসেবে আলুর সঙ্গে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে তিনি এলাকায় এক নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তার এই কৃষি বিপ্লবে ছায়া হয়ে ছিলেন মাইজখার ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জালাল উদ্দিন। কৃষকের একাগ্রতা আর সঠিক পরামর্শ যে কত দ্রুত ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে, কামারখোলা গ্রামের এই চিত্র তারই বড় প্রমাণ।

সাধারণত কৃষকরা জমিতে একটি প্রধান ফসলের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু মাসুম বিল্লাল চিরাচরিত প্রথা ভেঙে একই জমিতে দুটি ফসল চাষের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আলুর চাষ তো আগে থেকেই চলছিল; কিন্তু আলুর সারিতে ফাঁকা জায়গায় মিষ্টি কুমড়ার চারা রোপণ করে তিনি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। এতে করে আলুর জন্য দেওয়া সার ও শেষ সেচেই মিষ্টি কুমড়ার চারাগুলো পুষ্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বাড়তি জমির প্রয়োজন না হওয়ায় উৎপাদন খরচ যেমন কমেছে, তেমনি একই শ্রম ও সেচ ব্যবস্থার মধ্যে দুটি লাভজনক ফসলের ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মাসুম বিল্লালের সেই ৩৩ শতাংশ জমিজুড়ে যেমন আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে, তেমনি ঝুলে থাকা ডগা ও লতায় লতায় বড় হয়ে উঠেছে অসংখ্য মিষ্টি কুমড়া। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মাসুম বিল্লালের মোট খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে বীজ, জমি প্রস্তুতকরণ, সার এবং শ্রমিকের মজুরি অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে বাজারের ঊর্ধ্বগতি এবং ফসলের গুণগত মান বিবেচনা করে তিনি আশা করছেন, এই জমি থেকে উৎপাদিত আলু ও মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করে তার আয় হবে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি মূল পুঁজির চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ মুনাফা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। কৃষি পণ্য বিক্রির এই সম্ভাব্য অঙ্ক কামারখোলাসহ আশপাশের এলাকার তরুণ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। অনেকে এখন মাসুম বিল্লালের জমিতে এসে আধুনিক এই কৃষি কৌশল স্বচক্ষে দেখে যাচ্ছেন এবং আগামীতে নিজেরাও সাথী ফসল চাষের পরিকল্পনা করছেন। মাসুম বিল্লালের এই সফলতার পেছনে পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করেছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জালাল উদ্দিন। তিনি নিয়মিত মাসুম বিল্লালের জমিতে গিয়ে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেছেন। মাটির উর্বরতা রক্ষা করে কীভাবে কম খরচে অধিক ফলন পাওয়া যায় এবং কোনো নির্দিষ্ট পোকা বা বালাই আক্রমণ করলে তাৎক্ষণিক কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে তিনি সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

সরকারি পর্যায়ের এই কৃষি সেবাকে মাঠপর্যায়ে কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ফলেই মাসুম বিল্লাল আজ এই লাভের মুখ দেখছেন। মাঠ কর্মকর্তাদের সঠিক তদারকি ও কৃষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তির সংমিশ্রণে যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষিকে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করা সম্ভব, তা এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।এই ধরনের মিশ্র চাষ বা সাথী ফসল পদ্ধতি বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে অত্যন্ত কার্যকর। কারণ এখানে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ সীমিত। মাসুম বিল্লাল তার ৩৩ শতাংশ জমিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আলুর দাম যখন বাজারে ওঠানামা করে, তখন মিষ্টি কুমড়া কৃষকের জন্য একটি বাড়তি আয়ের সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে। একদিকে আলুর পুষ্টিগুণ এবং অন্যদিকে মিষ্টি কুমড়ার বহুমুখী ব্যবহার সব মিলিয়ে মাসুম বিল্লালের এই উদ্যোগ ছিল সময়ের সাহসী দাবি। তার এই বাম্পার ফলন শুধু কামারখোলা গ্রামের উন্নয়ন নয়, বরং কুমিল্লার কৃষি অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।