জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে ‘উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি’
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

বঙ্গোপসাগরের লোনা বাতাসে ঘেরা প্রান্তিক জনপদ খুদুকখালী। এখানে মানুষের শৈশব বড় হয় ঝড়ের গল্প শুনে, যাদের স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ‘ঘূর্ণিঝড় মেরিঅ্যান’র করুণ স্মৃতি। এক রাতেই ভেঙে পড়েছিল হাজারো মানুষের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন আর নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই জনপদে ঠিক ১৯ বছর পর জন্ম নেয় এক আলোর বাতিঘরের, নাম উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি। ‘অন্ধকারে আলোর প্রদীপ’ স্লোগান ধারণ করে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলো হাতে নিয়ে এই পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়, দুর্যোগ আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা গ্রন্থাগারটি ১৬ বছর পেরিয়ে আজ পরিণত হয়েছে উপকূলের জ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা।
২০১০ সালে পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৪টি চেয়ার, একটি টেবিল, একটি বুকশেলফ আর ২০টি বই নিয়ে। মানুষের ভালোবাসা ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে তা আজ রূপ নিয়েছে প্রায় ৯ হাজার বইয়ের গণপাঠাগারে। পাঠাগারের নামে ক্রয়কৃত ২২ শতক জমির ওপর নিজস্ব ভবনে চলছে পাঠ কার্যক্রম। আশপাশের চারটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ব্যবহারে পাঠাগারের পাঠাগারের কার্যক্রম দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁশখালী থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছনুয়া ইউনিয়ন। অনুন্নত যোগাযোগ ও দারিদ্র্যের কারণে একসময় পাঠ্যবই ছাড়া অন্য কোনো বইয়ের দেখা পাওয়া ছিল দুষ্কর। দৈনিক পত্রিকা পড়াও ছিল বিলাসিতা। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদে গ্রামের যুবক সাঈফী আনোয়ারুল আজীম বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার প্রতি আগ্রহী এই যুবক বিশ্বাস করতেন, বই-ই মানুষকে বদলে দিতে পারে। সেই বিশ্বাসে তিনি গড়ে তোলেন উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি। এই পাঠাগারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছেছে। পাঠকরা বই পড়ার পর ১৫ দিনের জন্য বাড়িতেও নিতে পারেন। গ্রন্থাগার ও পাঠকের মধ্যে গড়ে উঠেছে অদৃশ্য আত্মিক সেতুবন্ধন।
সদস্য রফিক উদ্দিন বলেন, এই পাঠাগার না হলে এত বই দেখার সুযোগই পেতাম না। এখানে পাঠ্যবইয়ের বাইওে বিভিন্ন বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। পাঠাগারে দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম, মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, গবেষণা, অর্থনীতি, অনুবাদ সাহিত্যসহ প্রায় ৯ হাজার বই রয়েছে। উপমহাদেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীদের গ্রন্থও রয়েছে প্রচুর। ৫ আগস্ট পরবর্তী গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস, সংবাদপত্রের কাটিং, বিবৃতি, সাক্ষাৎকার ও আলোকচিত্রও সংরক্ষিত আছে। এ আর্কাইভ পাঠক, গবেষক ও শিক্ষার্থীকে সময়ের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। লাইব্রেরি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়; এটি স্বপ্ন দেখার আঙিনা। সদস্য সুমাইয়া আকতার বলেন, এখানে বই পড়ে মনে হয় আমরা নতুন ডানা মেলে উড়তে শিখছি।
লাইব্রেরিতে প্রতিদিন ৩০-৩৫ জন নারী পাঠকের উপস্থিতি চোখে পড়ে। ২০১০ সাল থেকে সামাজিক কটূক্তি পেরিয়ে তারা নিয়মিত বইপাঠে যুক্ত হয়েছেন। গ্রন্থাগারিক রেশমিনা বলেন, কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে নারীদের ভয় ভেঙেছি। আজ তারা সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। এটি পাঠাগারকে ‘নারী জাগরণের বাতিঘর’ হিসেবে পরিচিত করেছে।
ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় লাইব্রেরি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৪ সালের টর্নেডো, ২০১৬ সালের ‘রোয়ানু’ ও ২০২৩ সালের ‘হামুন’-এ নষ্ট হয়েছে প্রায় ২ হাজার বই। গ্রন্থাগারিক মোবারকা বেগম জানান, প্রকৃতির দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাজারো দুর্লভ বই রক্ষার জন্য একটি টেকসই ভবন প্রয়োজন। প্রথম দিকে নারী পাঠকের জন্য নানা বাধা ছিল। কেউ বলত মেয়েরা ‘অতিরিক্ত স্বাধীন’ হয়ে যাবে বা পরিবারে কথা শুনবে না। কিন্তু পাঠকরা থেমে থাকেননি। এখন লাইব্রেরিতে তিনজন নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।
তারা একসময় পাঠক ছিলেন, এখন লাইব্রেরির দৈনন্দিন কার্যক্রম দেখাশোনা করছেন। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি রক্ষা করতে লাইব্রেরি উদ্বোধন হয় ওই তারিখে। সংবাদ প্রতিবেদন, ছবি ও স্মৃতিচিহ্ন এখানে সাজানো আছে সুন্দরভাবে। পাঠকরা এগুলো দেখে উপকূলের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ অনুভব করেন। পাঠাগারের শুরুর দিনগুলোতে ছিল মাত্র এক টেবিল, দুইটি চেয়ার। আজ ১৪টি টেবিল, ১২০টি চেয়ার, ১৮টি বুকশেলফ ও ৯ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে। নিবন্ধিত পাঠক ১৫০ জনের বেশি, ৯৫ শতাংশ নারী।
লাইব্রেরি বিকাল ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। গ্রামে বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সীমিত। বিজ্ঞান চর্চার পরিধি বাড়াতে পাঠাগারে যুক্ত হয়েছে ‘উপকূলীয় বিজ্ঞান ক্লাব’। ২০২৫ সালে এটি জাতীয় বিজ্ঞান প্রযুক্তি জাদুঘর থেকে বিজ্ঞানসেবী সংগঠন হিসেবে নিবন্ধন লাভ করে। ক্লাবে ২০০টির বেশি বিজ্ঞানবিষয়ক বই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও একটি টেলিস্কোপ রাখা হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে ৪র্থ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যসহায়ক গাইড বই। পাঠাগারের সদস্যরা গাইড বইগুলো বাড়িতে নিয়ে যায়। নারীরাও বাড়িতে বই নিয়ে যায়, যা সামাজিক পরিবর্তনের বড় চিহ্ন। টিন ও বেড়ার দুইতলা ভবন অনেকবার ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২৩ সালের ঘূর্ণিঝড় হামুনে বড় অংশ ধ্বংস হলেও থেমে থাকেনি পাঠ কার্যক্রম। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সাঈফী আনোয়ার জানান, ‘সবচেয়ে বড় বাধা দুর্যোগ। স্থায়ী ভবনের স্বপ্ন দেখি যেখানে বই নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে না।’ এ জনপদের নারীরা বহু বছর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে পিছিয়ে ছিল। লাইব্রেরি তাদের চোখে নতুন দিগন্ত খুলেছে। তারা বই পড়ে, আলোচনা করে, আত্মরক্ষার বিষয়ে জানতে পারে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ জামশেদুল আলম বলেন, পাঠাগারটির উন্নয়নের প্রশাসন সহায়তা দিয়েছে। এটির স্থায়ী ভবন নির্মাণের সময় প্রশাসন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি আজ শুধু একটি পাঠাগার নয়; এটি উপকূলের মানুষের দৃঢ়তা, শেখার ইচ্ছা, স্মৃতি, প্রতিবাদ ও সম্ভাবনার এক সংরক্ষণশালা। ১৬ বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়, লোনা বাতাস, জলাবদ্ধতা ও সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই আলোকশিখা জ্বালিয়ে রেখেছে এই গণপাঠাগার। এটি প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অন্ধকারের ভেতরেও আলোর পথ তৈরি করা যায়।
