পেয়ারা চাষ করে কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এ.এইচ.এম.আরিফ, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ার মিরপুরের সালাউদ্দিন জিকু। শিক্ষিত বেকার যুবক। লেখাপড়া শেষ করে, চাকরি না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। এজন্য তিনি বেশ কিছু টাকাও জমান। হঠাৎ মত পাল্টান তিনি। নিজে দেশে থেকেই কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। বিদেশ না গিয়ে সেই টাকা দিয়ে নিজের মাত্র দুই বিঘা জমিতে করে পেয়ারা বাগান। এলাকায় একেবারেই নতুন বাণিজ্যিকভাবে তিনি এ চাষ শুরু করে। এর পরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি জিকুকে।
বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, বিভিন্ন উন্নত জাতের কুলসহ বিশাল এক সমন্বিত ফলের বাগান। নানান ধরনের ফলের গাছ দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন তার বাগান। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে এ ফল বাগান থেকে তিনি বেশ সাফল্য পাওয়ায় তার দেখা দেখি আরো অনেক যুবক এ ফলের বাগান তৈরি করেছেন।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম আটিগ্রামের এই সালাউদ্দিন জিকু ফল বাগানে সাফল্য অর্জন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২০১৯ সালে প্রথম মাত্র দুই বিঘা জমিতে ‘থাই-৩’ জাতের পেঁয়ারা দিয়ে শুরু করেন এ ফল চাষ। তিনি ছাড়াও এখন তার বাগানে প্রতিদিন হচ্ছে চারজনের কর্মসংস্থান।
সালাউদ্দিন জিকু জানান, পড়ালেখা শেষ করে আমি বিদেশে যাওয়ার জন্য কিছু টাকা জমিয়ে একজনের কাছে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিদেশ যাওয়া না হওয়ায় আমাকে আমার টাকা ফেরত দিয়ে দেন। তারপরে চিন্তা করলাম আমি আর বিদেশ যাব না, দেশে থেকেই কিছু একটা করব। আমি সকলকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে, একজন বিদেশ গিয়ে কি করছে আর আমি মাটি থেকে উৎপাদন করে কি করছি। তিনি বলেন, শুরুটা গল্পের মত সহজ ছিল না। আমার পাশে কেউ ছিল না। একতে বেকার তার উপরে বয়সও কম। তাই বেশ ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। আমার দাদা তখন বেঁচে ছিলেন। আমি আমার দাদাকে পেঁয়ারা চাষ করে যে লাভ করা যায় সেটা বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখালাম। তখন দাদার অনুপ্রেরণায় আমি সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মিরপুর উপজেলা সাবেক কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে পরামর্শ করি পেঁয়ারা চাষ সম্পর্কে।
তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই বিঘা জমিতে ‘থাই পেঁয়ারা-৩’ জাতের পেঁয়ারা চাষ শুরু করি। তখন যে টাকা হাতে ছিল তা দিয়ে শুধু চাষ আর চারা কেনার টাকাটা হয়েছিল। দুই বিঘা জমিতে আমি ৪০০ পেঁয়ারার গাছ রোপণ করি। পরে বাগানের চারপাশ ঘেরার জন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার করেছিলাম বছরে তাকে ১০ হাজার টাকা বেশি দেব এই শর্তে।
প্রথমবারেই বেশ ভালো পেয়ারা পায়। সেটা বিক্রি করেই সেই ৫০ হাজার টাকা শোধ করেও ভালো লাভ ছিলো। পেয়ারা চাষ সম্পর্কে তিনি বলেন, পেয়ারা চাষের জন্য মাটিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেলে-দোয়াশ মাটিতে পেয়ারা ভালো ফলন পাওয়া যায়। তাছাড়া পেয়ারা চাষের জন্য মূলত গাছের পরিচর্যটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কার্টি, পেয়ারা ব্যগিং করলে ভালো হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমার এই ২০ বিঘার ফল বাগানের মধ্যে ১১ বিঘা জমিতে পেয়ারা, ৮ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের কুল (কাশমেরী-৩ বিঘা, বলসুন্দরী-৫ বিঘা), ১২০টি কমলা গাছ, ১০০টি মালটা গাছসহ বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। তিনি বলেন, কার্টিং এবং ব্যগিং করেছি। যাতে করে গাছে ফুল ও ফল বেশি আসে। পেয়ারা গাছে নতুন কুশিতে কুশিতে ফল আসে। আর ব্যগিং করলে বিষমুক্ত ফল উৎপাদন করা যায়। পেয়ারা চাষ খুবই লাভজনক। পেয়ারা বাগানে এ বছর প্রচুর পেঁয়ারা এসেছে। বিঘাপ্রতি প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ হবে। আর বাজারে পেয়ারার চাহিদাও বেশ ভালো। সারা বছরই প্রায় পেয়ারা ধরে গাছে। জিকু বলেন, এক বিঘা জমিতে যেখানে ধান চাষ করে বছরে ১০ হাজার টাকা লাভ করা যায় না সেখানে পেয়ারা চাষ করে লাখ টাকা লাভ করা যায়।
তিনি এখন নিজেই পেয়ারা, কুল, মালটা, কমলাসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের চারা উৎপাদন করে অন্য চাষীদের কাছে বিক্রি করে। তিনি এখন অন্য যুবকদের কাছে রিতিমতো মডেল। তার চাষাবাদ দেখে অনেকেই পেয়ারা চাষে আগ্রহ দেখিয়েছেন। একই এলাকার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ এলাকার কৃষক জিয়াউর রহমান জানান, জিকুর পেয়ারা বাগান দেখে আমিও দেড় বিঘা জমিতে পেয়ারা বাগান করেছি। আশা করছি ভালো পেয়ারা পাব। জিকুর মতো পেয়ারা চাষ করে বেশ সাফল্য পেয়েছেন মিরপুর উপজেলার গৌড়দহ গ্রামের এনামুল হক। তিনি ৬ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ করেছেন। গাছ লাগানোর আট মাসের মাথায় ফল এসেছে। বছরে দুইবার তার জমিতে ফল আসে। পেয়ারা চাষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ফলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে জানান এনামুল হক। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল্লহ আল মামুন জানান পেয়ারা চাষ খুবই লাভজনক।
বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ করে মিরপুর উপজেলার অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন। বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশজ ফল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। জিকু এই মিরপুর উপজেলার সফল ফল চাষিদের মধ্যে একজন অন্যতম। তার দেখা দেখি অনেকেই পেয়ারা চাষ করেছেন। বিগত ৫ বছরে মিরপুর উপজেলায় ফল উৎপাদন প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। আমরা কৃষক ও তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের ফল বাগানের উপরে প্রশিক্ষন ও পরামর্শ প্রদান করছি। যাতে ফল উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়।
