ভৈরব সিংহের জমিদার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের পুরাতন স্থাপনাকীর্তির একটি নিদর্শন হলো কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল গ্রামে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভৈরব সিংহের জমিদার বাড়ি। যা কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল ইউনিয়নের মহিচাইল বাজারের সামান্য পশ্চিম দিকে অবস্থিত। চান্দিনা উপজেলা সদর হতে ৮-৯ কিমি দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত। সুন্দর নকশা করা একটি আশ্চর্যজনক বাড়ি। বাড়িটি এমনভাবে কারুকাজ করে তৈরি করা হয়েছে যা একবার কেউ দেখলে যেন ফিরতেই মন চায় না।
বর্তমানে কালের পরিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় এখন আর বাড়িটির সেই সৌন্দর্য রূপ চেহারা আর নেই। আস্তে আস্তে হারাতে বসছে জমিদারের সেই বিলাসবহুল বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন। ৩ তলা জমিদার বাড়িটি ভেঙে এখন ২ তলায় পরিণত হয়েছে। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে বাড়িটি। ভেতরে বড় বড় কক্ষ। সংরক্ষণের অভাবে বর্ষাকালীন সময়ে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে কক্ষের ভেতরে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেছে ছোট একটি দরজা। উকি দিলে দেখা যায় মাটির নিচে কক্ষের মতো। তৎসময়ে যেসব প্রজারা সঠিক সময়ে খাজনা পরিশোধ করতে পারতো না তাদের এই কক্ষে আটকে রাখা হতো। ইংরেজি ইউ আকৃতির বাড়িটি। তবে একটি বাড়ির ছাদ থেকে অন্যটি ছাদে যেতে পুলের মতো পথ তৈরি করা হয়েছে। কক্ষগুলোতে জমিদারি আমলের চিহ্ন এখনও রয়েছে। বড় মটকি, আটা তৈরি করার যাতা, খাট-চেয়ার, পাথরের ওপর রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য, বেশ কিছু মূল্যবান পাথরসহ আরও কিছু তৈজসপত্র।
মূল জমিদার বাড়ির ২ তলায় রয়েছে একটি জলসা ঘর। যেখানে নাচণ্ডগান হতো। দেয়ালগুলো এখনও সেই স্মৃতি বহন করে চলছে। প্রতিটি দেয়ালে ছোট ছোট খোপ আছে। ধারণা করা হচ্ছে এসবে শরাব রাখা হতো। জলসা ঘরের নকশা বেশি আকর্ষণীয়। দেখার মতো সব। জলসা ঘরে অবচেতন মনেই যেন নুপুরের আওয়াজ আসে মনে হয়। কোথাও থেকে যেন বীণার সুর ভেসে এলো কানে। দেয়ালে কারুকাজ স্পষ্ট। এখন সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। ৩ তলায় একটি সিংহের মূর্তি ছিল। ৩ তলা ক্ষয়ে গেছে। তাই এখন আর সিংহের মূর্তিটিও নেই।
বিশাল এলাকাজুড়ে জমিদার ভৈরব সিংহের জমিদারি তালুক ছিল। যার মধ্যে সাচার, চান্দিনা, দেবিদ্বার, বরুড়া, মুরাদনগর ও কুমিল্লা শহরের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। যার মধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে ৬৪টি পুকুর ছিল। এছাড়াও জমিদার বাড়ির অদূরে একটি বড় দিঘি রয়েছে। ওই দিঘি কাটার সময় শ্রমিকরা পাশে একটি ছোট গর্তে কোদাল পরিষ্কার করতো। অনেক শ্রমিক মিলে কোদাল পরিষ্কার করতে করতে ছোট গর্তটি একটি বড়সর পুকুরে পরিণত হয়েছে। পুকুরটি এখন কোদাল ধোয়া পুকুর নামে পরিচিত। পুকুরটি দেখতে বেশ নান্দনিক লাগছে।
মহিচাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের জায়গাটি জমিদার ভৈরব সিংহের দেওয়া। বিদ্যালয়ের সামনে কতো বড় মাঠ। মাধাইয়া থেকে মহিচাইল পর্যন্ত সড়কটি প্রায় ৭ কিমি দীর্ঘ। এই সড়কটিও জমিদার ভৈরব সিংহের তৈরি। বাড়ির পাশের পুকুর পাড়ে রয়েছে জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহের সমাধিস্থল। যাতে লেখা রয়েছে স্বর্গীয় ভৈরব চন্দ্র সিংহের নাম। জন্ম ১২৫৯ বঙ্গাব্দ, মৃত্যু ১৩৩৬।
জমিদার বাড়িতে বেশ কয়েকটি পরিবার বাস করেন। তাদের মধ্যে একটি পরিবার রয়েছে। তারা জমিদারদের পঞ্চম প্রজন্ম বলে দাবি করেন। এ বাড়ির ছেলে সুজন চন্দ্র দে। তিনি জানান, জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহ সর্ম্পকে তার বড় বাবা। জমিদার বাড়ির বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখান। কোনো ঘরে কি আছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সুজন জানান, তার মা এ বাড়ির অনেক ইতিহাস জানেন। সুজনের মায়ের নাম লক্ষ্মী রানী দে। জমিদার বাড়ির বউ। কথা হয় উনার সঙ্গে। লক্ষ্মী রানী দে জানান, ১৯৫২ সালে তার জন্ম। তাই এ বাড়ির কিছু ইতিহাস তিনি জানেন এবং কিছু দেখেছেন। জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহের দুছেলে। হরধর চন্দ্র সিংহ ও কামিনি চন্দ্র সিংহ। জমিদার বাড়ির প্রবীণ মানুষ ক্ষিতিশ চন্দ্র সিংহ। তিনি পেশায় ছিলেন মহিচাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি ২০১৬ সালে মারা যান। ধারণা করা হচ্ছে তিনি জমিদার ভৈরব সিংহের নাতি ছিলেন। জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহ বেশ প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন ছিল জমিদার বাড়ির মানুষজনের। দূরবর্তী যাতায়াতের জন্য জমিদার বাড়ির পুরুষরা হাতি ও ঘোড়া ব্যবহার করতেন।
নারীদের জন্য পালকি ছিল। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর অনেক বছর পর্যন্ত সেই পালকিটি ছিল। লক্ষী রানী দে সেই পালকিটি দেখেছেন। পরে সংরক্ষণের অভাবে পালকিটি নষ্ট হয়ে যায়। দূর্গাপূজায় এই বাড়িতে বড় বড় মহিষ বলি দেওয়া হতো। তখন বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষের জমায়েত হতো। বাড়িটিতে দীর্ঘ সময় ধরে উৎসব হতো। সময়ের কালক্রমে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি হয়। ভেঙে পড়ছে জমিদারি বাড়িটি। নেই সেই উৎসব।
