আট একর জমির খেজুর বাগানে আশার আলো

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর

শীত এলেই গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে ভেসে আসত মাটির চুলায় জ্বলা খেজুরের গুড়ের ঘ্রাণ। গাছে গাছে ঝুলতে দেখা যেত মাটির হাঁড়ি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই মাটির হাঁড়ির খেজুর রস পরিণত হতো সোনালি গুড়ে। সেই গুড় ঘিরেই জামাই-জন, আম্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে বাড়িতে বসতো নানান পিঠাণ্ডপুলির উৎসব। কুলিপিঠা, ভাপা, পাটিসাপটা, চিতই ও দুধচিতইসহ সব বাহারি স্বাদের পিঠার আড্ডায় জমে উঠত পারিবারিক মিলনমেলার। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য আজ ফিকে হয়ে আসছে। ইটভাটা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নগরায়ণ আর অবহেলার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুরগাছ, বিপন্ন হতে বসেছে গ্রামবাংলার শীতের ঐতিহ্যের পিঠ-পুলির পারিবারিক উৎসব।

এই সংকটকে মাথায় রেখে শরীয়তপুরের সখীপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের আনু সরকারকান্দি গ্রামে লন্ডন প্রবাসী ইয়াকুব কাজী ২০২৩ সালে আট একর জমিতে সাড়ে তিন হাজার দেশীয় খেজুরগাছ রোপণ করেন। তার এই উদ্যোগ নতুন করে জ্বালিয়েছে আশার আলো। তার লক্ষ্য নিরাপদ খেজুর রস সংগ্রহ, খাঁটি গুড় উৎপাদন এবং গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে পুনর্জাগরিত করা। এতে শুধু খাঁটি খেজুর রস ও গুড়ের সংকটই দূর হবে না ফিরতে শুরু করবে প্রাণ-প্রকৃতির নবরূপ। চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা এই খেজুরগাছের বাগানটিকে ঘিরে বিকাল থেকেই হরেক রকমের পাখিদের কলকাকলি দেখতেও অনেকেই আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন, এর আগে দেশীয় প্রজাতির খেজুর গাছের বাগান স্বেচ্ছায় করতে দেখিনাই। এই বাগানটি দেখলে এখন মন ভরে যায়। যেভাবে আদর-যত্নে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠছে তাতে মনে হয় আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই এখান থেকে খাঁটি খেজুর রস ও গুড় আমাদের শীতের পিঠার পারিবারিক উৎসবকে আবার জমে উঠবে।

বাগানের ইনচার্জ সোলেমান কাজী বলেন, ইংল্যান্ড প্রবাসী ইয়াকুব ভাই শুধুই ব্যবসায়িক চিন্তায় নয়, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের শীতের পিঠাপুলি’র পারিবারিক উৎসব ফিরিয়ে আনতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করছি আগামী দুই তিন বছরের মধ্যেই বাগান থেকে ভেজালমুক্ত খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে শরীয়তপুর জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের জেলাগুলোতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব শরীয়তপুরের উপদেষ্টা কবি শাহজালাল মিয়া বলেন, যেভাবে ইটভাটাসহ নানান আগ্রাসনে খেজুরগাছ বিলীন হয়েছে, তাতে পরিবেশ প্রকৃতি রক্ষা আর গ্রামীন ঐতিহ্য ফেরাতে এমন উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। খেজুরগাছ শুধু উচ্চমূল্যের ফসল নয়, এটি আমাদের বাঙালী সংস্কৃতির অংশ। চরাঞ্চলে খেজুরগাছ লাগানো হলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

শরীয়তপুরের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাসেল নোমান বলেন, একসময় ইটভাটার আগ্রাসন ও নগরায়ণের ফলে আশঙ্কাজন হারে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। তাছাড়া খেজুরগাছ শুধু রস বা গুড়ের সংস্থান করে না, মাটির ক্ষয় রোধ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও খেজুরড়গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে বিধায় বাতাস ও ঝড়ের ক্ষতিও কম হয়। তাই অধিক পরিমাণ খেজুরগাছ রোপণের মাধ্যমে যেমন প্রাণ-প্রকৃতিতে ফিরবে নবজীবন তেমনি জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিতেও রাখবে সহায়ক ভুমিকা।

শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, খেজুরগাছ একটি কম যত্নের গাছ। একবার বড় হয়ে গেলে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। একটি গাছ ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত রস দিতে পারে। এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক একটি বিকল্প ফসল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। খেজুরগাছের বাগানে সাথীফসল আবাদ করে কৃষকরা অতিরিক্ত আয়ও করতে পারেন। আমরা মাটির উপযোগিতা যাচাই করে দুর্গম চরাঞ্চলসহ উপযুক্ত জমিতে উন্নত জাতের খেজুরগাছ রোপণে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি এবং প্রয়োজনীয় সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি ধীরে খেজুরগাছের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুনর্জাগরিত হবে শীতের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক পিঠাপুলি’র সংস্কৃতি।