নওগাঁয় মুকুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষি
পাঁচ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের আশা
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নওগাঁ প্রতিবেদক

আমের জেলা হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁ। গাছে গাছে মুকুলের মণ্ডম গন্ধে মুখরিত চারপাশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর পর্যায়ক্রমে মুকুল আসছে। ভালো দাম পাওয়ার আসায় পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে চাষিরা। এই সময়ে একটি অসাধু চক্র ভেজাল কীটনাশক বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। ভেজাল রোধের প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছে কৃষক।
এছাড়া আম সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপন করাসহ প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা হলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এ জেলা আরও এগিয়ে যাবে। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে- এ বছর জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। যা থেকে প্রায় ৪২৫ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
বরেন্দ্র ভূমি হিসেবে পরিচিত জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। জেলায় যে পরিমাণ আম বাগান রয়েছে তার ৭০ শতাংশ রয়েছে এসব উপজেলায়। যেখানে আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা ও বারী-৪ সহ প্রায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন হয়। এ জেলার আম অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এসব আম ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।
চাষিরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর পর্যায়ক্রমে গাছে মুকুলের দেখা মিলেছে। মুকুলে রোগাবালাই নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক স্প্রেসহ পরিচর্চায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। প্রতি বিঘা জমিতে আম চাষে সার, কীটনাশক, পানি ও শ্রমিক দিয়ে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ পড়ে। যা থেকে প্রায় লক্ষাধিক টাকা আয় সম্ভব। জেলার পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়ার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রায়হান আলম বলেন- ২২০ বিঘা জমিতে বাগান আছে। এরমধ্যে নিজের জমি ১৫ বিঘা হলেও বাকি জমি ইজারা নিয়ে আম বাগান গড়ে তুলা হয়েছে। ৮০ জমিতে গৌঢ়মতি, ৫০ বিঘায় বারি-৪ ও বাকি জমিতে আম্রপালি গাছ। গত বছর মুকুলের অবস্থা ভালো ছিল না। একই সময়ে আম বাজারে আসছিল। এতে বাজারদর কম থাকায় লাভের অঙ্ক ছিল কম। তবে এ বছর পর্যায়ক্রমে গাছে মুকুল আসায় গাছে আম ভালো আসবে এবং লাভের আশা করছি। এছাড়া রপ্তানিযোগ্য কিছু গাছের আলাদাভাবে পরিচর্চার করা হচ্ছে।
শিশাবাজার এলাকার আমচাষি পারভেজ মারুফ বলেন- আম সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয় চাষিদের। জেলায় আমের হিমাগার স্থাপন করাসহ প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আরও এগিয়ে যাবে। পোরশা উপজেলার মশিদপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আকমল হোসেন বলেন- আবহাওয়া ভালো থাকায় গাছে গাছে প্রচুর মুকুল দেখা দিয়েছে। পঁচনরোধে মুকুলে ছত্রাকনাশক স্প্রে এবং মুকুল থেকে গুটি আসা শুরু হলে জমিতে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সাপাহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের আমচাষি আসগর আলী বলেন, গত বছর দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় একই সময়ে আম বাজারে আসায় দামও ছিল কম। তবে এ বছর আমের মুকুল পর্যায়ক্রমে আসছে।
এতে আমও পর্যায়ক্রমে বাজারে উঠবে। মৌসুমের শুরু থেকে দুই হাজার থেকে আড়াই টাকা মণ বিক্রির আশা করা হচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন- আমের মুকুল আসা প্রায় শেষ পর্যায়ে। গাছে গাছে ভালো মুকুল আসছে। লাভজনক হওয়ায় জেলায় প্রতিবছরই বাড়ছে আম বাগান।
চাষিরা সারা বছর আম উৎপাদন করে লাভবান হতে পারে এজন্য উন্নত জাতের আমের চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া রপ্তানিযোগ্য আম উন্নয়ণ প্রকেল্পের মাধ্যমে আম উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন প্রদর্শনী দেওয়া আছে।
রপ্তানি পরিসর বাড়াতে উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বরেন্দ্র এলাকা হওয়ায় পানি স্বল্প থাকায় বাগান বাড়ছে এবং সেচের পরিমাণও কম দিতে হয়। অর্থনৈতিভাবে কৃষকসহ এর সঙ্গে জড়িতরা লাভবান হচ্ছে। এ বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আমের বাণিজ্যের আশা করা হচ্ছে।
