ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ব্যবহার নেই
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

জেলা শহরের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ঢাকাসহ দূরপাল্লাগামী গাড়িগুলো স্থানান্তরের জন্য কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত এর সুফল ভোগ করতে পারেনি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ। উদ্বোধন হয় কিন্তু কার্যকর হয় না। এবারও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও পৌরসভা ও জেলা মটর মালিক সমিতির উদ্যোগে শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় টার্মিনালে দূরপাল্লাগামী কোচ কাউন্টার উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু উদ্বোধনের ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
পূর্বের মতোই রাস্তা দখল করে দীর্ঘ সময় ধরে যাত্রী উঠা নামা করছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে বিএনপির তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এই ভবনটি উদ্বোধন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আমরা ঠাকুরগাঁওবাসী এই বাসটার্মিনালটি ব্যবহার করতে পারেনি। আজকে আমি অত্যন্ত আশাবাদী এই বাস টার্মিনটি ব্যবহার করে শ্রমিক ও পরিবহন মালিকরা আমাদের ঠাকুরগাঁওবাসী উপকৃত হবে। তিনি আরও বলেন, শহরের মধ্যে গাড়িগুলো প্রবেশ করলে যে অসুবিধ সৃষ্টি হয় তা আমাদের কষ্ট দেয়। বাস-ট্রাকের যারা মালিক বা শ্রমিক আছেন তাদের আমি অনুরোধ করব বাস-ট্রাক টার্মিনালে রাখলে আমাদের শহরটা আরও উন্নত হবেন।
সেই আহ্বানের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, নতুন উদ্বোধন হওয়া কোচ কাউন্টারগুলো অন্ধকারে নিস্তব্ধ পড়ে আছে। নেই কোনো যাত্রী, নেই কোনো দূরপাল্লার গাড়ির উপস্থিতি। অন্যদিকে, শহরের প্রধান সড়কগুলোতেই আগের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকাগামী গাড়িগুলো। সেখানেই চলছে যাত্রী ওঠাণ্ডনামা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীসহ সাধারণ মানুষ।
একাধিক পথচারী বলেন, আমরা প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে হাটা চলা করি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, বয়স্ক মানুষ সবাইকে বাসের ফাক গলে রাস্তা পার হতে হয়। দূরপাল্লার কোচগুলো যেভাবে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে, তাতে জীবন হাতে নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। একটু অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
খোকন নামে এক পথচারী বলেন,মন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু আহ্বান দিয়ে দায়িত্ব শেষ নয়। বাস মালিক-শ্রমিকরা যদি কথা না মানে, তাহলে প্রশাসন কী করছে? আইন কি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য? শহরের সড়ক দখল করে প্রকাশ্যে নিয়ম ভাঙা হচ্ছে, অথচ ব্যবস্থা নেই এটা মেনে নেওয়া যায় না। শহর আমাদের সবার, কিছু মানুষের সুবিধার জন্য পুরো শহর জিম্মি থাকতে পারে না।
রুবেল নামে এক চাকরিজীবী বলেন, ঈদের অজুহাত দেখিয়ে যদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে কবে হবে? আমরা আর আশ্বাস চাই না, কার্যকর পদক্ষেপ চাই।
ঠাকুরগাঁও জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রচার সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, শহরের যানজট নিরসনের জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও আমরা কাউন্টার সরানোর বিষয়ে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। পৌরসভা, মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন একসঙ্গে বসে আমরা দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিব। ঠাকুরগাঁও জেলা মটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দানেশ আলী বলেন, সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় যাত্রীচাপ অনেক বেশি। এই সময়ে হঠাৎ রুট ও কাউন্টার পরিবর্তন করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আমরাও চাই শহর যানজটমুক্ত হোক, তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কোচ কাউন্টারের ম্যানেজার জানান, লিখিত নির্দেশনা বা প্রস্তুতির সময় না দিয়েই উদ্বোধন করা হয়েছে। কাউন্টার সরানো, যাত্রীদের অবহিত করা, টিকিটিং ও স্টাফ সমন্বয় সবকিছু একদিনে সম্ভব নয়। টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ও সুনির্দিষ্ট রুট নিশ্চিত না হলে কার্যক্রম চালু করা কঠিন বলেও তারা জানান।
ঠাকুরগাঁও জেলা মটর মালিক সমিতির সভাপতি সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল চালুর বিষয়টি কিছুটা তড়িঘড়ি করেই হয়েছে। উদ্বোধন হয়েছে, কিন্তু এখনো টার্মিনালের ঘর ও কাউন্টারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ভাড়া নির্ধারণ, চুক্তি, টিকিট কাউন্টার চালু, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে হঠাৎ করে কাউন্টার স্থানান্তর করা বাস্তবসম্মত নয়।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক আরাফাত রহমান বলেন, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে খুববি শিগগিরই চালুর জন্য প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, যদি সড়কে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠাণ্ডনামা করে, তাহলে প্রশাসন কঠোর হতে বাধ্য হবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
