নেত্রকোনার লোক-ঐতিহ্যের বিস্মৃত সুর ‘গাইনের গীত’
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
এক সময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামবাংলার আকাশে ভেসে উঠত এক রহস্যময় সুর। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে এলে দূর থেকে শোনা যেত ঢোলের মৃদু তাল, মন্দিরার ঝংকার আর এক গীতালুর দীর্ঘ টান। গ্রামের মানুষ তখন বুঝে নিত গাইনের দল এসেছে। শুরু হবে গাইনের গীতের আসর।
পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের গ্রামবাংলায়, বিশেষ করে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার জনপদে এক সময় এই গাইনের গীত ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত ধারক। লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, কাব্যধর্মী বর্ণনা ও সুরের মূর্ছনায় ভর করা এই গানের আসর ছিল গ্রামীণ সমাজের এক অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। এটি ছিল বিনোদনের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক শিক্ষা এবং লোকঐতিহ্যের এক সম্মিলিত প্রকাশ।
কেন্দুয়া উপজেলার বলাই শিমুল ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ বলেন, গাইনের গীত পরিবেশনকারীদের প্রধান শিল্পীকে বলা হতো ‘গীতালু’ বা ‘গাজীর গাইন’। সময়ের পরিবর্তনে তাদের নামের সঙ্গে ‘বয়াতি’ উপাধি যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্তমানে অনেকেই এই শিল্পীদের বয়াতি নামেই চেনেন।
‘গাইন’ শব্দটির অর্থ গায়ক বা গাইয়া। গাইনের দল সাধারণত তিন থেকে চারজন সদস্য নিয়ে গঠিত হতো। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আচার-আচরণেও ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অনেকের লম্বা চুল, গলায় তসবিহ ও নানা রঙের মালা, আর হাতে থাকত একটি বিশেষ দণ্ড- যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আশা’। আশার অগ্রভাগ অনেকটা ত্রিশূলের মতো, যার মাথায় অর্ধচন্দ্র খচিত লোহার দণ্ড বসানো থাকত। গীতালুর হাতে থাকত একটি লোমশ চামর। কখনও তা দিয়ে তিনি ভক্তদের আশীর্বাদ দিতেন, আবার কখনও গানের আবহে নাটকীয়তা সৃষ্টি করতেন।
গাইনের গীত পরিবেশনের জন্য কোনো বড় মঞ্চের প্রয়োজন হতো না। কোনো গৃহস্থের উঠান, গাছের ছায়াতলা কিংবা বাড়ির আঙিনাই হয়ে উঠত গানের মঞ্চ। কখনও দিনের আলোয়, আবার কখনও রাতের নিস্তব্ধতায় শুরু হতো গানের পালা। গ্রামবাসীরা চারদিকে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনতেন গীতালুর কণ্ঠে ভেসে ওঠা পালাগান।
এই গানের মূল উপজীব্য ছিল গাজী পীর ও কালু পীরের জীবনকাহিনী। তাদের জীবনসংগ্রাম, অলৌকিক ক্ষমতা, ধর্মীয় মাহাত্ম্য এবং মানবকল্যাণের গল্প কাব্যিক ভাষা ও সুরের মূর্ছনায় পরিবেশন করতেন গীতালুরা। অনেক সময় এই গানের পালা চলত রাতভর।
গ্রামীণ সমাজে বিশ্বাস ছিল গাজীর গীত পরিবেশন করলে পরিবারের অমঙ্গল দূর হয়, রোগ-বালাই কমে এবং অশুভ শক্তির প্রভাব নষ্ট হয়। তাই অনেক পরিবার মানত বা মানসিক করে এই গানের আয়োজন করতেন।
গাইনের গীতের কথা বলতে গিয়ে কেন্দুয়া উপজেলার পিজাহাতি গ্রামের প্রবীন সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব জহিরুল ইসলাম স্বপন স্মৃতিচারণ করে বলেন, গীতালুর কণ্ঠে যখন পালা শুরু হতো, তখন মনে হতো আমরা যেন অন্য এক জগতে চলে গেছি। তার কাব্যধর্মী বর্ণনা, ছন্দের ওঠানামা আর সুরের আবেশে কখন যে রাত কেটে যেত, টেরই পাওয়া যেত না।
গানের ফাঁকে ফাঁকে গীতালুরা নানা উপদেশমূলক ছন্দও শোনাতেন।
সংসারজীবন, নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা- এসব বিষয় নিয়ে থাকত তাদের উপদেশ। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে নারীদের আচরণ ও পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে থাকত সতর্কতামূলক বাণী। যদিও এসব ছন্দে অনেক সময় নারীর আচরণ নিয়ে সমালোচনার বিষয় থাকত, তবুও গ্রামের মানুষ এগুলোকে সামাজিক শিক্ষা হিসেবেই গ্রহণ করতেন।
গানের আসর শেষে গৃহস্থ পরিবার শিল্পীদের সম্মান জানাত চাল, ডাল, ফল, সবজি কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী নগদ অর্থ দিয়ে। গীতালু তখন তার হাতে থাকা আশা, ত্রিশূল বা চামর দিয়ে উপস্থিত সবাইকে আশীর্বাদ করতেন। এরপর তারা আবার অন্য গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করতেন। এভাবেই মাসের পর মাস গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াত গাইনের দল।
বিশিষ্ট ছড়াকার, পালাকার ও লোকজ সংস্কৃতির গবেষক বাবু রাখাল বিশ্বাস বলেন, সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক বিনোদনের বিস্তার এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে আজ গাইনের গীত প্রায় বিলুপ্তির পথে।
তার ভাষায়, এক সময় এই গানের আসর ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ। কিন্তু টেলিভিশন, মোবাইল ও আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে এখন সেই পরিবেশ আর নেই।
তবে এখনও নেত্রকোনার কিছু এলাকায় আব্দুল জব্বার বয়াতি, মনসুর বয়াতি, সবুজ বয়াতি, দিলু বয়াতি, পাঞ্জু বয়াতি ও আশিক বয়াতির মতো কয়েকজন গীতালু এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের কণ্ঠে এখনও মাঝেমধ্যে শোনা যায় গাজীর গীতের সেই পুরনো সুর।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, গাইনের গীত শুধু একটি সংগীতধারা নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের বিশ্বাস, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক মূল্যবান অংশ। তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নথিবদ্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে এই লোকঐতিহ্যকে পরিচিত করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি উঠছে। কারণ বাংলার মাটির এই সুরগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি নয় এগুলোই গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস।
