মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম না পেয়ে দিশাহারা কৃষক

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলমাস আলী, ঈশ্বরদী (পাবনা)

মুড়িকাটা পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও দাম নিয়ে হতাশায় ভুগছেন ঈশ্বরদীর পেঁয়াজ চাষিরা। এ বছর পেঁয়াজের দাম আশানুরূপ না পাওয়ায় লোকসান গুণতে হচ্ছে পিয়াজ চাষিদের। বর্তমানে বাজারে মুড়িকাটা পেঁয়াজ প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ঈশ্বরদী উপজেলায় মোট ৮৫০ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় মুড়িকাটা, হালি ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ব্যাপক উৎপাদন হয়। বিশেষ করে লক্ষিকুন্ডা, চরগড়গড়ি, বিলকাদা, কৌকুন্ডা, কামালপুর ভাড়ইমাড়ি, ছলিমপুর, সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার অন্য এলাকায়ও অল্পবিস্তর পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে।

সরেজমিনে গত শুক্রবার ও শনিবার ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন পেঁয়াজের বাজার ঘুরে ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতি মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ চাষিদের ভাষ্য- উৎপাদন খরচ, শ্রমিক মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বিবেচনায় এই মূল্য বিক্রি করায় তাদের ব্যাপক লোকসান গুণতে হচ্ছে। প্রতি মণ পিয়াজের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪০০ টাকা ১৭০০ টাকা। বাজারে মানভেদে মুড়িকাটা পেঁয়াজ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। আকারে ছোট পেঁয়াজের দাম আরও কম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উপজেলার আড়মবাড়ীয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায় রাব্বি নামক খুচরা সবজি ব্যবসায়ী পেঁয়াজ ৫ কেজি ১০০ টাকা, ৫ কেজি ১০০ টাকা বলে ডেকে ক্রেতাদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। এতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। তিনি বলেন, পাবনার আতাইকুলা থেকে পেঁয়াজ কিনে পরিবহন খরচ বাদে তিন টাকা লাভে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। এদিকে উপজেলার আওতাপাড়া হাটে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা পিঁয়াজ চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ আগেও তারা ১০০-২০০ টাকা লাভে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে বর্তমানে পেঁয়াজের বাজার অর্ধেকে নেমে আসায় প্রতি মণ পিঁয়াজে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। বাজারে পেঁয়াজ চাষিদের অনেকেই লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছেন।

তারা আরও বলেন, এখনও মাঠে অনেক পেঁয়াজ রয়েছে। সামনে ঈদ ছেলেমেয়েদের কাপড়সহ অন্য ঈদ খরচ মেটাতে নগদ অর্থের প্রয়োজনের কারণে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলে লোকসানেও তারা পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। এতে ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম দামে পেঁয়াজ কিনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে সবজি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আমদানি বেশি ক্রেতা কম। মুড়িকাটা পেঁয়াজটা বেশি দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। চাষিরা একসঙ্গে সব পেঁয়াজ মাঠ থেকে উঠাতে শুরু করেছেন। এদিকে বাজার থেকে পেঁয়াজ ক্রেতার সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন আজকাল ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে করে প্রতিটি গ্রাম মহল্লায় হাত মাইক দিয়ে ক্রেতার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে হলুদ, আদা ও পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। বেশিরভাগ ক্রেতাই ঘরের দুয়ার থেকেই ভ্রাম্যমাণ ভ্যান গাড়ির বিক্রেতার কাছ থেকেই পেঁয়াজ কিনছেন। যারা নগদ অর্থ বাদে বাকিতে কিনছেন তারাই বাজারে সবজি বিক্রেতার দোকান থেকে পেঁয়াজ কিনছেন।

উপজেলার পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকাগুলো ঘুরে চাষিদের সঙ্গে কথা বললে চাষিদের দাবি, বাজারে পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তারা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতেন এবং আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষে আরও উৎসাহিত হতেন।

উপজেলার সেখেরচক গ্রামের পেঁয়াজ চাষি গোপালপুর উত্তর পাড়ার মাঠে দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বছর আমি ২ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাষ করেছি। এক বিঘা জমি থেকে পেঁয়াজ উঠানো হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। বিঘায় উৎপাদন হয়েছে ৫০ মণ। পেঁয়াজ উৎপাদনে বিঘায় জমির ইজারাকট মূল্য বাদে জমি চাষ, বীজ ক্রয়, সার, নিড়ানি, সেচ, শ্রমিক, পরিচর্যা ও কীটনাশক বাবদ খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এক বিঘা জমি থেকে পেঁয়াজ উঠাতে খরচ হয়েছে ১৬ শ্রমিক, যাদের অতি জনের দিন মজুরি ৬০০ টাকা হিসেবে খরচ হয়েছে ৯৬০০ টাকা। মাঠ থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে ২০০ টাকা ভ্যান ভাড়া। গাছ থেকে পেঁয়াজ কাটতে মহিলা শ্রমিকদের প্রতি কেজি ২ টাকা হিসাবে মণে খরচ হয়েছে ৮০ টাকা। বাড়ি থেকে ভ্যানে বাজারে নিতে খরচ হয়েছে ২০০ টাকা। এখনও এক বিঘা জমির পেঁয়াজ জমিতেই রয়েছে। গত শুক্রবার আকাশে মেঘ দেখে বুক ধরফর করছিল। এখন বাজারে এসে দেখি যে দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে তাতে ব্যাপক লোকসান হবে। তিনি বলেন, বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লে হইচই পড়ে যায় কিন্তু এখন পেঁয়াজ চাষিদের যে ব্যাপক লোকসান হচ্ছে তাতে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় দায়।

এভাবে যদি লোকসান হতে থাকে, তাহলে আমাদের মতো কৃষকদের জন্য কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তখন বাধ্য হয়ে হয়ত কৃষি কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে হবে। এর পাশাপাশি আমরা যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে আবাদ করি, আমাদের বিঘাপ্রতি আরও বার্ষিক ২০ হাজার টাকা লিজ মানি দিতে হয়। ফলে আমাদের খরচ বিঘাপ্রতি ৬০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, এখন মুড়িকাটা পেঁয়াজের ভরা মৌসুম চলছে। কৃষকদের অনুরোধ করছি একটু সময় নিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করার জন্য।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজ চাষিদের দাবি, যেহেতু তারা বিনিয়োগের টাকা উঠাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। সেহেতু সারের দাম কমানো এবং পেঁয়াজ আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ বেশি দিন রাখা যায় না। প্রায় এক সঙ্গে পেঁয়াজ উঠিয়ে বাজারে নিয়ে আসায় চাহিদার চাইতেও অনেক বেশি পেঁয়াজের আমদানি হচ্ছে। এতে লোকসান হবে না, লাভ হয়তো কম হবে। এছাড়াও উপজেলায় আমরা ৫টি এয়ার ফ্লো মেশিন দিয়েছি। প্রতিটি মেশিনে ২০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবে। একটু সময় নিয়ে পেঁয়াজ বাজারজাত করলে কৃষক বেশি লাভবান হবেন।