নদ পারাপারে ছয় গ্রামের মানুষের ভরসা বাঁশের সাঁকো

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. আজাদ, মহেশপুর (ঝিনাইদহ)

নদের এক পাশে ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দুই পাশে রয়েছে ৬টি গ্রাম।

যে গ্রামগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। আর এই মানুষগুলোর বড় এবং একমাত্র ভোগান্তির কারণ একটি বাঁশের সাঁকো। জলিলপুর-যুগিহুদা গ্রামের মধ্যে কপোতাক্ষ নদে রয়েছে এই সাঁকোটি। যার উপর দিয়ে এলাকার মানুষ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে পারাপার করছে।

স্থানীয়রা জানান, এই স্থানে একটি সেতুর দাবি তাদের দীর্ঘদিনের, কিন্তু সেতু নির্মাণ হয়নি। ২৫ বছর মানুষ নৌকায় পার হয়েছেন, আর ২৫ বছর সাঁকো দিয়ে। গত বছর নদী খননের সময় সেই সাঁকোটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, এলাকার মানুষ নিজেদের অর্থায়নে আবার তৈরি করেছেন। এই অবস্থা ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা শহরের উত্তর পাশের গ্রামগুলোর।

যুগিহুদা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, মহেশপুর উপজেলা শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এই নদের দুই পাড়ে রয়েছে জলিলপুর, যুগিহুদা, কদমতলা, সড়াতলা, নিমতলা ও বেড়েরমাঠ গ্রাম। যার মধ্যে যুগিহুদা গ্রামটির তিন পাশে ঘিরে রেখেছে এই কপোতাক্ষ নদটি। তিনি আরও জানান, এই সব গ্রামগুলোর মানুষের দৈনন্দিন সব কাজ মেটাতে হয় জলিলপুর বাজারে। এই বাজারেই রয়েছে একটি কলেজ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মেয়ে ও ছেলেদের পৃথক দুইটি মাদ্রাসা। যে সব প্রতিষ্ঠানে গ্রামগুলোর ছেলে মেয়েরা পড়ালেখা করে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই বাঁশের সাঁকো পরাপার হয়।

রবিউল ইসলাম জানান, যে স্থানে বর্তমানে সাঁকো রয়েছে তার দুই পাশে তিন কিলোমিটার দূরে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর পাশের লোকজন উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু ৬ গ্রামের মানুষকে মহেশপুর বা জলিলপুর শহরে যেতে হলে কমপক্ষে ৪ কিলোমিটার ঘুরতে হচ্ছে।

মহেশপুর পৌর মহিলা কলেজের শিক্ষক ও যুগিহুদা গ্রামের বাসিন্দা এমএ আসাদ জানান, ছোট বেলায় দেখেছেন ৬টি গ্রামের মানুষ কষ্ট করে নৌকায় পার হচ্ছেন। পারাপারের খাজনা হিসেবে অনেকের মাসিক চুক্তিও ছিল। এরপর ৯০ দশকে এলাকার মানুষ গ্রামে গ্রামে বাঁশ সংগ্রহ করে সাঁকো তৈরি করলেন। এই সাঁকো দিয়ে সবাই পার হতে শুরু করেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সাঁকো থাকে না, ভেঙেচুরে যায়। প্রতি দুই বছর পর নতুন করে সাঁকো তৈরি করতে হয়।

তিনি জানান, নতুন করে সাঁকো তৈরি করলে কিছুদিন মোটামুটি চলাচল করা যায়। এরপর ভেঙেচুরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোতেই চলাচল করতে হয়। এভাবে চলতে চলতে প্রায় ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। গত বছর কপোতাক্ষ নদ খনন করা হয়েছে। এই খননের সময় তাদের তৈরি বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে দেওয়া হয়। তখন মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না। গত ডিসেম্বর মাসে তারা আবার নতুন করে সাঁকো তৈরি করেছেন। এই সাঁকো তৈরি করতে তাদের অনেক টাকা ব্যয় হয়। যা এলাকার মানুষ তাদের প্রয়োজনে দেন।

সরেজমিনে সাঁকোর স্থানে গিয়ে দেখা যায় সব সময় সাঁকোর উপর মানুষ রয়েছে। কেউ এপার থেকে ওপারে আবার কেউ ওপার থেকে এপারে যাচ্ছেন।

শেফালী বেগম নামের এক বৃদ্ধা কষ্ট করে বাঁশ ধরে সাঁকো পার হলেন। তিনি জানান, বাবা এতো কষ্ট করা যায় না। নুর আলী নামের অন্য পথচারী জানান, মধ্যে মধ্যেই পত্রিকায় দেখি অপ্রয়োজনীয় সেতু। দুই পাশে রাস্তা নেই, মাঝখানে সেতু। আর আমাদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সেতু হচ্ছে না। ৬ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের ও পাশের গ্রামগুলোর মানুষ এখন কাজ করে সাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। তাদের দৈনন্দিন তেমন কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা একটাই চলাচলে বাঁশের সাঁকো। যার দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশা করেন।

জলিলপুর বাজার কমিটির সভাপতি হায়াত আলী জানান, সেতুটি খুবই প্রয়োজন। কোমলমতি বাচ্চারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো দিয়ে পার হয়। যা দেখলে সবারই ভয় হয়। অনেক দুর্ঘটনাও ঘটেছে এই সাঁকোতে। তিনি বলেন, প্রতি বছর আমরা বাজার থেকে টাকা তুলে এই বাঁশের সাঁকোটি মেরামত করে আসছি।

জলিলপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তি রানী বসু জানান, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশ কয়েকটি যুগিহুদা গ্রামের বাচ্চা লেখা পড়া করে। তারা খুবই কষ্ট করে এই সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে।

জলিলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুজ্জামান জানান, আমাদের বিদ্যালয়ে যুগিহুদা, কদমতলা, সড়াতলা, নিমতলা ও বেড়েরমাঠ গ্রামের বেশ কয়েকটি ছেলে মেয়ে পড়াশুনা করে। তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার করে স্কুলে আশা যাওয়া করে। কিন্তু কী করব বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি একটি ব্রিজের জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

এলজিইডি-র মহেশপুর উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ শাহরিয়ার আকাশ জানান, তারা এই স্থানে একটি সেতু করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনুর্ধ্ব ১০০ মিটারের একটি সেতুর জন্য তিন দফা প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেতুটি নির্মাণ হোক। তিনি বলেন, প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পেলে তারা সেতুর কাজ শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন।