নওগাঁয় দেশীয় মাছ সংকটে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আব্বাস আলী, নওগাঁ

মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত নওগাঁর আত্রাই উপজেলা। শুঁটকি উৎপাদনে উপজেলা হিসেবেও পরিচিত। তবে এবছর অসময়ে বন্যা হওয়ায় দেশীয় মাছের সংকটে শুঁটকির উৎপাদন কমেছে। এছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে ?বৃহৎ শুঁটকি মাছের একটিমাত্র মোকাম হওয়ার কারণে আড়তদারদের সিন্ডিকেটে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শুঁটকি ব্যবসায়িরা।

অপরদিকে ভারতে রপ্তানি না হওয়ায় কমেছে শুঁটকির দাম। এতে আয়েও ভাটা পড়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়িরা। শুঁটকির বাজার এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে এসব ব্যবসায়িরা স্থানীয় অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

জেলার আত্রাই উপজেলা নদী ও বিলসহ প্রায় শতাধিক জলাশয় রয়েছে। এ উপজেলার আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম। প্রতি বছর জলাশয়ের পানি কমে আসলে এ নদীর তীরে শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত থাকে ব্যবসায়ি ও শ্রমিকরা। তবে এ বছর দেশীয় মাছের সংকটে ব্যস্ততা যেমন কমেছে, তেমনি শুঁটকি উৎপাদনও কমেছে। কাঁচা মাছের সংকটে অধিকাংশ চাতাল ফাঁকা পড়ে রয়েছে। তবে এ উপজেলার শুঁটকির কদর রয়েছে দেশজুড়ে। শুধু দেশেই নয়, ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরা রয়েছে শুঁটকির কদর। এ উপজেলার আহসানগঞ্জে মাছের আড়ৎ গড়ে উঠেছে। যেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে এ আড়তে মাছ বিক্রি করে চাষি ও ব্যবসায়িরা। এ আড়ত হওয়ার ব্যবসায়িদের কাঁচা মাছ কিনে সহজে শুঁটকি উৎপাদন করতে পারে।

ব্যবসায়িরা জানান- এ বছর অসময়ে বন্যা হওয়ায় দেশীর মাছের উৎপাদন কমেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর কাঁচা মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। প্রতিকেজি কাঁচা মাছ টাকি ২০০ টাকা থেকে ২৫০, খলিশা ৭০-৯০ টাকা কেজি, পুটি ৬০-১৭০ টাকা এবং চাঁন্দা ৫০-৬০ টাকা। তবে শৈল ও বোয়ালসহ অন্যান্য দেশী মাছ না পাওয়ায় শুঁটকি হচ্ছে না। অনেক চাতাল (মাচা) ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সাড়ে ৩ কেজি টাকি ও চাঁন্দা মাছ শুকিয়ে ১ কেজি শুঁটকি হয় এবং ৫ কেজি পুঁটি থেকে ১ কেজি শুঁটকি উৎপাদন। প্রতিকেজি টাকি মাছের শুঁটকি ৪০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা, পুঁটি ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা ও চাঁন্দা ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের শুঁটকি ব্যবসায়ি ওসমান শেখ বলেন- গত প্রায় ২০ বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসায়া করছি। এ বছর ১০ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছি। গত বছর থেকে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমেছে। এ বছরও কম। দেশীয় মাছের সংকটে প্রতিযোগিতা করে কাঁচা মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আবার শুঁটকি উৎপাদন করে মোকামে বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও বছর শেষে সব খরচ বাদে আড়াই লাখ টাকা লাভের আশা করছি। যা দিয়ে চলে সারা বছর ভরণপোষণ।

শুঁটকি ব্যবসায়ি মনজু মোল্লা বলেন- সারাদেশে কমবেশি শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। তবে নীলফামারীর সৈয়দপুরে ?বৃহৎ শুঁটকি মাছের মোকাম। এ একটিমাত্র মোকাম হওয়ার কারণে আড়ৎদারদের সিন্ডিকেটে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ৪৪ কেজিতে মণ বিক্রি করতে হয়। এছাড়া শতকরা ৮ টাকা কমিশন দিতে হয়। এতে প্রতিলাখে ৪ হাজার টাকা কমিশন কেটে নেয় তারা। তাদের সিন্ডিকেটের কারণে লাভের পরিমাণ কম আসে। তবে ভারতে শুঁটকি রপ্তানি শুরু হলে দাম আরো বাড়তি হবে।

শ্রমিক আলতাফ হোসেন বলেন- মহাজনরা আড়ৎ থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে। এরপর আমরা আত্রাই নদীর পানিতে পরিস্কারের পর লবন দিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি। মাছ পরিস্কারে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০-৬০ জনের। বছরে প্রায় ৬মাস কাজ হবে। এরপর অন্য কাজ করা হয়।

নওগাঁর আত্রাই সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মাকসুদুর রহমান বলেন- এ উপজেলায় ২৬ জন ব্যবসায়ি শুঁটকি উৎপাদনের সাথে জড়িত। এছাড়াও আরও শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এবছর অসময় বন্যা হওয়ায় দেশীর মাছের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বাজার গড়ে উঠায় মাছগুলো বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে। এতে শুঁটকি ব্যবসায়িরা তাদের প্রয়োজনমতো কাঁচা মাছ সংগ্রহ করতে পারছে না। তবে এ বছর ২০০ টন শুঁটকি উৎপাদনের আশা। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।