শ্যামপুর চিনিকল পুনরায় চালুর দাবি

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৬৭ সালে উৎপাদন শুরু করা শ্যামপুর সুগার মিল একসময় লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। রংপুরের একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকল পুনরায় চালুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে শ্রমিক, চাষি ও সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলেই বন্ধ হয়ে থাকা এই মিলটিতে আবারও চিনি উৎপাদন শুরু হবে এমন আশায় বুক বেঁধে আছেন সবাই। তবে ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পার হলেও কার্যত কোনো অগ্রগতি না থাকায় সেই আশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গত ২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের ফলে অন্তর্বরতীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৪ সালের ডিসেম্বরে বন্ধ থাকা কয়েকটি চিনিকল পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় মিলটি চালুর উদ্যোগ থমকে আছে।

গংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত অর্থ ছাড় না হলে মিলটি চালু করা সম্ভব নয়, আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাজারো মানুষের জীবিকা ও পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৬৭ সালে উৎপাদন শুরু করা শ্যামপুর সুগার মিল একসময় লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মিলের দৈনিক আখ মাড়াই ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ১৬ টন এবং বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার ১৬১ টন। মিল চালু থাকাকালে মৌসুম এলেই চারপাশে জমজমাট পরিবেশ সৃষ্টি হতো শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য, আখবোঝাই ট্রাকের সারি আর মেশিনের শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। মিলের ভেতরে আগাছা, বাইরে সুনসান নীরবতা যেন একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা।

?২০০০ সালের পর থেকে মিলটি ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়তে থাকে। ব্যাংক ঋণ, সুদ, শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন কারণে লোকসান বাড়তে বাড়তে দাঁড়ায় প্রায় ৫০৫ কোটি টাকায়। এই পরিস্থিতিতে সাবেক সরকারের সিদ্ধান্তে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে মিলটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও মিল কর্তৃপক্ষ আখ উৎপাদন কমে যাওয়া ও পুরনো যন্ত্রপাতিকে দায়ী করেছিল, শ্রমিক ও চাষিরা এর পেছনে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার। স্থায়ী কর্মচারীদের কেউ বদলি হয়েছেন, কেউ অবসরে গেছেন। তবে অস্থায়ী শ্রমিকদের অধিকাংশই কাজ হারিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে আখচাষেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার একর জমিতে আখ চাষ হতো, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে পুরো বদরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে ৩০০ একরে। বদরগঞ্জের কুতুবপুর সোনারপাড়ার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আখ চাষে সময় বেশি লাগে, লাভও অনিশ্চিত। এখন ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষ করি লাভও বেশি, সময়ও কম লাগে। মিল চালু হলেও আবার আখচাষে ফিরব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

শ্যামপুর চিনিকল অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান বলেন, এই মিলকে কেন্দ্র করে হাজারো পরিবার চলত। এখন তারা চরম সংকটে। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হবে। তিনি আরও বলেন,? মিল চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ শুরু হয়নি। অবকাঠামো উন্নয়ন, মেশিন মেরামত, জনবল নিয়োগ সবই এখনও কাগজে-কলমে। আর কিছুদিন গেলে হয়তো এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান ধংস হয়ে যাবে।

?বর্তমানে মিলটিতে প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু তাদের বকেয়া মাসের প্রায় ১ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, আমরা প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। অর্থ ছাড় হলেই দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। বর্তমান তেমন কোনো এ বিষয়ে অগ্রগতি নেই। শ্যামপুর চিনিকল চালুর জন্য ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। কিন্তু লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন করে অর্থ ছাড়ে আপত্তি জানিয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। টাস্কফোর্স চালুর সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন আটকে আছে অর্থের অভাবে।

?স্থানীয় ব্যবসায়ী মুরাদ ইসলাম বলেন, এই মিল ছিল এলাকার অর্থনীতির কেন্দ্র। এখন ব্যবসা কমে গেছে, অনেকেই কাজ হারিয়েছে। মিল চালু হলে আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, আগে আখ বিক্রি করে ভালো আয় হতো। এখন সেই সুযোগ নেই। মিল বন্ধ থাকায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মিল চালু করতে হলে শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি, দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সমন্বয়। এসব নিশ্চিত করা গেলে মিলটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক করা সম্ভব। শ্যামপুর চিনিকল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয় এটি উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রতীক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক প্রভাবও পড়ছে ব্যাপকভাবে। এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দ্রুত অর্থ বরাদ্দ এবং কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে মিলটি চালু করা গেলে শুধু একটি শিল্পই পুনর্জীবন পাবে না পুনরুজ্জীবিত হবে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের স্বপ্ন।