৯ বছর ধরে ভেঙে পড়ে আছে পুনর্ভবা নদীর ব্রিজ
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের সিংড়া ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মাহানপুর সড়কে পুনর্ভবা নদীর ওপর নির্মিত একটি ছোট ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছর কেটে গেলেও তা পুনর্নিমাণ করা হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে ব্রিজটি মেরামতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় এলাকার অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৬ সালে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ব্রীজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নির্মাণের পরের বছর ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় নদীর তীব্র স্রোতে ব্রীজটির দুই পাশের মাটি ধসে পড়ে এবং এক পর্যায়ে পুরো কাঠামোটি ভেঙে যায়।
এরপর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ব্রীজের দুই পাশে পাকা রাস্তা থাকলেও মধ্যখানে ভাঙা অংশের কারণে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে কিছু মোটরসাইকেল চালক অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করলেও বর্ষা শুরু হলে পুরো এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই ব্রীজটি চালু থাকলে উপজেলা শহরে পৌঁছাতে যে সামান্য সময় লাগত, এখন সেতু না থাকায় বিকল্প পথে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুইয়েরই ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। এই ভাঙা ব্রীজের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
এলাকাটি সবজি উৎপাদনের জন্য বিশেষ পরিচিত হলেও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে তাদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। কৃষকরা জানান, উৎপাদিত সবজি বাজারে নিতে এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। ফলে লাভের বদলে অনেক সময় তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষিকাজে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের বাইরে নয়।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ে যাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে স্কুল-কলেজে যেতে হয়, আবার অনেকে ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা ব্রীজের পাশ দিয়ে নদী পারাপারের চেষ্টা করে। এর ফলে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় শিক্ষার্থী রফিক সে জানায়, অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে পার হতে গিয়ে ভিজে কাপড়ে ক্লাসে বসতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রীজটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মাহানপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই ছোট সেতুটি চালু হলে তাদের যাতায়াতের পথ অন্তত ১০ কিলোমিটার কমে যেত। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোপাল দেবশর্মা বলেন, একটি মাত্র ব্রীজের অভাবে পুরো এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে আছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সড়কটি এরইমধ্যে উন্নয়ন করা হয়েছে এবং ভেঙে যাওয়া ব্রীজটিও পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্রিজটি নতুনভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে দিনাজপুর-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম জানান, বীরগঞ্জ উপজেলার সিংড়া-মাহানপুর সড়কের পুনর্ভবা নদীর ওপর ভেঙে যাওয়া ব্রিজটি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এলাকার কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।
নয় বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজটি সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অবহেলা শুধু জনদুর্ভোগই বাড়াবে না, বরং এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অবিলম্বে নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
