কুষ্টিয়ায় পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় নিহত কথিত পীরের দাফন

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হামলায় নিহত কথিত পীর শামীম রেজা বা শামীম জাহাঙ্গীরের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকার রোববার বিকাল সাড়ে ৫টায় পুলিশ প্রহরায় দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে জানাজা শেষ তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।

জীবিত অবস্থায় উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় তার প্রতিষ্ঠিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ই সমাহিত হতে চেয়েছিলেন কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম। তার শিষ্য ভক্ত ও অনুরাগীদেও কাঁধে চড়েই শেষ যাত্রা করেছেন এই পীর সাহেব। দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো গ্রামে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

এর আগে বিকাল সাড়ে ৩টায় নিহত শামীম রেজার লাশ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার লাশ কবরস্থানে নেওয়া হয়। তবে কথিত ওই পীর শামীম রেজার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে তার ভক্ত ও অনুসারীদের উপস্থিতি ততটা লক্ষ্য করা যায়নি। দুই একজন ভক্তকে দেখা গেলেও এ বিষয়ে তারা কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।

এদিকে নিহত শামীম রেজার দাফন দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের তার নিজ আস্তানায় করার জন্য দু’একজন ভক্ত দাবি জানালেও নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সেটা সম্ভব হয়নি।

এদিকে শামীম রেজাকে হত্যার পর থেকে তার আস্তানা ও আশপাশের এলাকায় থমতমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আস্তানা বা দরবার শরীফে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া আস্তানার আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ছাড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

এ ঘটনায় গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) শেখ জয়নুদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকার কথা বলেছেন।

তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি এবং এ ঘটনায় কেউ আটক বা গ্রেপ্তার হয়নি বলে দৌলতপুর থানা পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার পর গত শনিবার রাতে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে (শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। হামলার ঘটনায় যারা আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়াও দৌলতপুরের হোসেনাবাদ এলাকার বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আলহাজ্ব রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। অপরাধী যেই হোক তার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা এটা কারো জন্য কাম্য হতে পারেনা। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন।

এরআগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিন-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত কথিত পীর শামীম রেজাকে তার আস্তানার দোতলার নিজ কক্ষ থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে তাকে পিটিয়ে ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দোতলর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে তার ভক্তরা উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতা শামীমের আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় কথিত ওই পীরের কয়েকজন নারীভক্তসহ অন্তত ৭ জন ভক্ত আহত হলে তারা দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন।

এরআগে কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দেওয়া পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরে তারা ফিলিপনগর আবেদের ঘাটে সংগবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শামীমের দরবার বা আস্তায় হামলা চালায়। এসময় হামলকারীরা কথিত পীর শামীম রেজাকে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে আস্তানায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এনিয়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে হামলার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তার আগে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। ২০২১ সালে একজনের লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নিজ আস্তানায় দাফন করা হলে সেসময় একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সে মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।