জ্বালানি সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে না.গঞ্জের অর্থনীতি

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোশতাক আহমেদ শাওন

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প কারখানার উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতে। ডিজেল সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যহারে কমে গেছে। একইসঙ্গে সংকটকে পুঁজি করে ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ৩-৪ হাজার টাকা। শুধু তা-ই নয়, জ্বালানি-সংকটে শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হতে শুরু করেছে। সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ও ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকসংকট, নদীবন্দরে ক্রেন বন্ধ এবং পণ্য আনলোড স্থবির হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি যদি এভাবে আর কদিন চলতে থাকলে খাদ্য, নিত্যপণ্যের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও কৃষিপণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। সেইসঙ্গে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

এদিকে এ সংকট মোকাবেলায় সরকারি রেশনিংয়ের আওতায় এনে পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল সরবারহ হলেও চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ তেল পাচ্ছেন তারা। এরফলে জেলা জুড়ে জ্বালানির দৈনিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে লোকসানের মুখে পড়েছেন সোনারগাঁও, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও শহরের পেট্রোল পাম্প মালিকরা।

ফিলিং স্টেশনের প্রতিনিধিরা বলছেন তারা ডিপো থেকে যখনই তেল পান তখনই দিচ্ছেন। তবে তেল বিক্রি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ডিপো থেকে তারা নিয়মিত তেল পাচ্ছেন না। কয়েকদিন পর পর সীমিত পরিসরে (রেশনিং) তেল পাচ্ছেন। এতে তারা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।

ফলে প্রেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নিতে পরিবহনের দীর্ঘ সাড়ি থাকলেও ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে চালকদের।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরের পণ্য সরবরাহব্যবস্থা অনেকাংশেই স্থবির হয়ে পড়েছে। ডিজেলের অভাবে এখন অচল হয়ে পড়েছে পাগলার মাদ্রাসাঘাট, দাপাঘাট ও মুন্সীখোলা ঘাটের ক্রেনগুলো। ফলে জাহাজ থেকে পণ্য নামানো প্রায় বন্ধ। যার ফলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি ও শিল্প কারাখানার উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা।

এদিকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বয়লার ব্যবহৃত হয়। বর্তমান সংকটে কারখানাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না। সে জন্য লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে।

অপরদিকে দেশের সারের প্রধান তিনটি মোকামের একটি হলো নারায়ণগঞ্জ। এখান থেকে ২৫টি জেলায় সার সরবরাহ করা হয়। জ্বালানি-সংকটে কৃষকের জন্য সারের সময়মতো সরবরাহ জরুরি, যা এখন ঝুঁকির মুখে। একই পরিস্থিতি নিতাইগঞ্জের চাল ও খাদ্যশস্য আড়তগুলোতে।

মানামা গ্রুপের ম্যানেজার আরজু জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০টি ট্রাক সার নিয়ে বিভিন্ন জেলায় যেত, এখন তা কমে ৩০টিতে নেমে এসেছে।

পাম্প মালিকদের অভিযোগ, তেল থাকুক বা না থাকুক, পাম্প পরিচালনার খরচ কিন্তু একই। পাগলা এলাকার জননী পাম্পের ম্যানেজার মোহাম্মদ আরমান মিয়া জানান, তাদের প্রতিদিনের চাহিদার ১০ হাজার লিটারের বিপরীতে বরাদ্দ মেলে মাত্র তিন হাজার লিটার। আর গত তিন দিন ধরে সেই সামান্য বরাদ্দও পাওয়া যাচ্ছে না।

আলীগঞ্জ মাদ্রাসাঘাটের ক্রেনের মালিক মোকারম সরদার জানান, ডিজেল না পাওয়ায় ক্রেন চলছে না। বর্তমানে ভুসি, ভুট্টা, গম ও সার নিয়ে ৩০টি লাইটার জাহাজ ঘাটে আটকে আছে। শ্রমিক দিয়ে অল্প কিছু পণ্য নামানো হলেও মূল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ।

সার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মানামা ট্রেডার্সের প্রতিনিধি আরজু জানান, পণ্য নামানোর উপায় না থাকায় বিপুল পরিমাণ সার জাহাজে আটকা পড়ে আছে। পাশাপাশি সরবরাহ করতেও ট্রাকের সংকটের কারণে বিপদে পড়ে আছি।

পঞ্চবটি পরিবহন ট্রান্সপোর্টের মালিক সোহাগ বলেন, আগে প্রতিদিন আমাদের এখানে পাঁচটি ট্রান্সপোর্ট মিলে ২০টি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের জন্য আমরা পাঠাতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাকই পাচ্ছি না, তাই দিনে চার-পাঁচটি ট্রাকের বেশি পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রিপে পাঠাতে পারি না।

ট্রাক মালিক আরমান বলেন, তেলের সংকটে ট্রাক ভাড়া টনপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবু তেল না থাকায় ট্রাকের ট্রিপ নিচ্ছি না। আগে প্রতি সপ্তাহে তিনটি ট্রিপ (আসা-যাওয়া) নিতে পারতাম, কিন্তু বর্তমানে একটির বেশি ট্রিপ নিতে পারছি না। নিজেদের এলাকায় দু-তিন দিন বসে থেকে তেল পেলেও দূরের জেলাগুলোতে তেল পাওয়া দুষ্কর, তাই দূরে ট্রিপ পাঠাচ্ছি না।’

আনোয়ার ট্রেডিংয়ের মালিক নিজামুদ্দিন রতন জানান, ট্রাকসংকটের কারণে ঢাকার বাইরে ১৫টি জেলায় চাল পাঠানো যাচ্ছে না।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় পণ্য উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ না বাড়ানো হলে পণ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, আমাদের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে ৪টি ডিপো ও জেলার ৫৫টি ফিলিং স্টেশনে মনিটরিং করা হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যবেক্ষণে ট্যাগ অফিসার কাজ করছে। ৪টি ডিপোসহ প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের মজুদ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশা করি দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।