হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

প্রকৃতির অনন্য স্থাপত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত বাবুই পাখি এখন আমাদের গ্রামবাংলার আকাশ থেকে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় গ্রামের তাল, নারিকেল, খেজুর ও সুপারি গাছের মাথায় সারিবদ্ধভাবে ঝুলতে দেখা যেত বাবুই পাখির নিখুঁত ও শৈল্পিক বাসা। সেই দৃশ্য এখন অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। সবুজ প্রকৃতিতে যখন দখিনা হাওয়া বইত, তখন বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর তাদের হাতের কাজের মতো নিপুণ বাসা তৈরির দৃশ্য ছিল গ্রামীণ জনপদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কালের বিবর্তনে, প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতায় এবং মানুষের অসচেতনতায় আজ এই পাখি বিলুপ্তির পথে। আবহমান গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা রূপটি এখন কেবল স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

বাবুই পাখি তার বাসা তৈরির দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাদের বাসাগুলো যেন প্রকৌশলবিদ্যার এক চমৎকার নিদর্শন। শক্ত ঘাস, খড়, লতাপাতা আর গাছের আঁশ দিয়ে তারা যে বাসা তৈরি করে, তা প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতেও টিকে থাকতে সক্ষম। একটি পুরুষ বাবুই পাখি তার সঙ্গী পাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে বাসা তৈরি করে। বাসাটি অর্ধেক তৈরি হলে সে নারী বাবুই পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য ডাকাডাকি শুরু করে। নারী বাবুই পাখি বাসা পরিদর্শন করে যদি সেটি পছন্দ করে, তবেই তারা সেখানে সংসার শুরু করে। এমন অদ্ভুত ও চমৎকার স্বভাবের পাখি আজ পরিবেশের চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা যায় আবাসস্থলের সংকট। আমাদের দেশ থেকে নির্বিচারে তাল, খেজুর ও নারিকেল গাছ কেটে ফেলার ফলে বাবুই পাখিরা তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় স্থান হারিয়েছে। যে গাছগুলোতে তারা নিরাপদে বাসা বাঁধত, সেই গাছগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় তারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ব্যাপক হারে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাবুই পাখির জীবনচক্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। জমিতে ছিটানো বিষাক্ত ওষুধের কারণে পাখিগুলো যেমন খাবারের অভাবে ভুগছে, তেমনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারাও যাচ্ছে। প্রকৃতির পরম বন্ধু বাবুই পাখি এখন পরিবেশ দূষণের শিকার। খাদ্যের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অনেক সময় শৌখিন মানুষের হাতে বাসা শিকার হওয়ার কারণেও তাদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। আগে যখন গ্রামবাংলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ থাকত, তখন বাবুই পাখিরা তাদের খাদ্যের অভাব বোধ করত না। কিন্তু এখন ফসলের মাঠ সংকুচিত হয়ে আসায় এবং প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় উজাড় হওয়ার ফলে এই ক্ষুদে পাখিটি টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।

পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বাবুই পাখি প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরা ফসলের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে কৃষকের উপকার করে। কিন্তু আজ মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে গাছ কেটে এবং প্রকৃতিকে দূষিত করে বাবুই পাখির মতো নিরীহ পাখিদের হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্ব অপরিসীম। যদি আমরা এখনই বাবুই পাখিদের আবাসস্থল রক্ষায় সচেষ্ট না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কেবল পাঠ্যপুস্তকে বা ছবিতে এই পাখির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য বেশি বেশি তাল ও নারিকেল গাছ লাগানো এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি জোরদার করা সময়ের দাবি। এছাড়া পাখি শিকার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে, প্রকৃতির এই শৈল্পিক প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশের সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে বাবুই পাখির অস্তিত্ব অপরিহার্য। গ্রামবাংলার আকাশ আবার যেন বাবুই পাখির কিচিরমিচিড়ে মুখরিত হয়, তার জন্য প্রয়োজন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

তাল গাছের মাথায় দোল খাওয়া সেই শৈল্পিক বাসাগুলো হারিয়ে গেলে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের এক বিশাল অংশই চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। তাই আসুন, গাছ লাগানো এবং প্রকৃতির যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে আমরা এই চমৎকার পাখিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বাসযোগ্য ও জীববৈচিত্র্যময় পৃথিবী গড়ে তুলি। বাবুই পাখি বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, আর প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচব আমরা সবাই।