সুনামগঞ্জে পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্ন

আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেওয়ান তাছাদ্দুক রাজা, সুনামগঞ্জ

গেল দু’দিনের অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর, দিরাই উপজেলার বরাম হাওর, চাপতির হাওর, টাংনির হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর, জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর, পাখিমারা হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

দিরাই ও শাল্লা উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সড়কগুলো এখন কোমর পানির নিচে। বিপুল সংখ্যক কৃষকের পাকা ধান তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টির পানিতে। একমাত্র সম্বল বোরো ধান হারিয়ে কৃষকরা আজ দিশেহারা। হাওর পাড়ের কৃষক পরিবারে এখন শুধুই আহাজারি।

কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির পানিতে একমাত্র সম্বল বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আবার যারা ধান কেটেছেন তারাও সেই ধান নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। পানি বৃদ্ধির ফলে বেশির ভাগ এলাকায় ধান শুকানোর ‘খলা’ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এদিকে, হাওরের উঁচু অংশের কিছু ধান পানির ছোবল থেকে রক্ষা পেলেও বৈরী আবহাওয়া আর বজ্রপাত আতঙ্কে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। বিভিন্ন হাওরের শতকরা ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হলেও ৪৫ থেকে ৪৮ ভাগ ধান তলিয়ে গেছে পানিতে।

গতকাল বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুরের কৃষক আলা উদ্দিন মিয়া বুক সমান পানি থেকে নিজের ধান কেটে আনার চেষ্টা করছিলেন। বললেন ১৫ কেয়ার (তিন কেয়ারে এক একর) জমি করছিলাম। ৭ কেয়ার কাটছি, ধান কিন্তু কাটা ধান খলায় থেকে পচে নষ্ট হচ্ছে। অন্য সাত কেয়ার ডুবে গেছে।

দেখার হাওরপাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর, সরদাবাজ, দরিয়াবাজসহ ওখানকার ১৫টি গ্রামে একই চিত্র।

আব্দুল্লাপুরের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বললেন, বজ্রপাতের ঝলকানি কান বন্ধ হয়ে যায় তবুও ছাড়ছে না কেউ হাওর। কিভাবে যাবে হাওরে ধান রেখে।

দেখার হাওরের পাশেই কোরবাননগর ইউনিয়নের বাওনের বিল হাওর। ওই হাওরপাড়ের লালারচর গ্রামের কৃষক অরুন রায় বললেন, বৃষ্টির পানিতে ধানের শীষের গলায় গলায় পানি। ধান কাটা শ্রমিক দিয়ে অর্ধেক নেবার চুক্তিতে ধান কাটছে। কেটে কী লাভ শুকাবে কীভাবে। অরুন রায় জানালেন, শহরের ধোপাখালি স্লুইসগেট দিয়ে বাওন বিলের পানি সুরমা নদীতে নামে। এখন সুরমা নদীতে পানি বাড়ায় স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এজন্য হাওরের ধান ডুবে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বললেন, দুইদিনে উপজেলার ৫০৫ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় ডুবেছে। এভাবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ডুবে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়তে থাকবে।

টানা বৃষ্টিতে জেলার আরেক বৃহৎ হাওর জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সেবক দাস বলেন, মঙ্গলবার দিনেও জমিতে পাকা ধান রেখে এসেছি। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে সর্বনাশ হয়ে গেছে। গতকাল বুধবার সকালে এসে দেখি জমির সব ধান তলিয়ে গেছে পানিতে। ১৬ একর জমির পাকা ধানের মধ্যে মাত্র চার একর জমির ধান কেটে তুলতে পেরেছি। বাকি জমির ধান এখন পানির নিচে।

কৃষক আলাখাছ মিয়া, মনা মিয়া, রবি দাস, হরিন্দ্রনাথ দাসসহ অনেক কৃষক বৃষ্টির পানিতে তাদের ফসল তলিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, পানি নিস্কাশনের কেনো ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে ফসলডুবি ঘটছে। তাদের দাবি হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ এবার তাদের জন্য মরণফাঁদ হয়েছে।

হাওরের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক শংকর দে জানান, তিনি ১৬ কেয়ার জমি চাষাবাদ করেছিলেন, কিন্তু মাত্র এক কেয়ার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিন ও রাতের বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিক সংকট থাকায় তিনি অনেক চেষ্টা করেও ফসল কাটাতে পারেননি।

কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান, আমার সব শেষ হয়ে গেল, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধার-দেনা করে জমি চাষাবাদ করেছিলাম, এখন সারাবছর কীভাবে চলব।

হাওরপাড়ের চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক খালেদ মিয়া জানান, নলুয়ার হাওরের অধিকাংশ জমির ফসল কাটতে পারেননি। শুরুতেই জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটে ভুগতে হয়। গত দুই দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের সব জমি তলিয়ে গেছে। তার ধারণা কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

দিরাই’র বরাম হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সেবুল মিয়া বলেন, বহু আশা-ভরসা নিয়ে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। কত কষ্ট করলাম কিন্তু কষ্টের ফসল আর কাটতে পারলাম না। এই কষ্ট কে দেখবে? এখন সহায় সম্বল হারিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকব এই চিন্তায় আছি।

টাংনির হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আক্কাছ আলি জানান, হাওরে তিনি কয়েক কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। এবার বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধান তলিয়ে গেছে। হাওরের বেশিরভাগ ধান এখন পানির নিচে বলে জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, গতকাল বুধবার পর্যন্ত পুরো জেলায় ৭ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দু’দিনের অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২ হাজার ৪৯৮ হেক্টর। গতকাল পর্যন্ত ৯২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে বলে দাবি করলেও কৃষি বিভাগের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

গতকাল সকালে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলার দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। বাঁধ দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত নয়। স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। এ ছাড়া দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকছিল।

গতকাল বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘন্টায় সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এই সময়ে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে পানি বেড়েছে ৩৪ সেন্টিমিটার। তবে, ওই সময় পর্যন্ত বিপদসীমার ২১৯ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ এবং ভারতের মেঘালয়ে ভারি থেকে অতি বৃষ্টিতে বন্যা সৃষ্টির আশংকার সতর্কতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এজন্যে পাউবোর সব হাওর রক্ষা বাঁধ পাহারা বসাতে পাউবোকে সুনামগঞ্জের নবাগত জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান নির্দেশ দিয়েছেন।

জানা গেছে, অতিবৃষ্টির পানিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় বাঁধ কেটে দিয়ে হাওরের পানি কমানোর দাবি উঠেছে। তবে, আগের তুলনায় নদনদীতে পানির উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলার ১২৩ হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। আবাদকৃত জমি থেকে ১৪ লাখ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি বিভাগ।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, এ পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি ধান কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে, এই মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিক বিষয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।