সুনামগঞ্জের হাওরে সর্বস্ব হারিয়ে কৃষকের আর্তনাদ

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেওয়ান তাছাদ্দুক রাজা চৌধুরী, সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের হাওরে এবার কৃষকের কান্নার রোল পড়েছে। বৃষ্টিপাত,অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওরের সোনালি ফসল ডুবে একাকার হয়ে গেছে। একমাত্র ফসল হারানোয় কৃষকরা আজ বাকরুদ্ধ। এবার জেলার ১২টি উপজেলার সবমিলিয়ে ১৯৯টি ছোট বড় হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৩ হাজার ৭২৪ মেট্রিকটন ধান। যার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বললেও কৃষক নেতারা বলছেন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

একদিকে ধান কাটার যন্ত্র হারভেস্টার পানিতে চলছে না। অন্যদিকে রয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। যদিও মাঝেমধ্যে ধানকাটার শ্রমিক পাওয়া যায় তাদের মজুরি খুব বেশি। এ পরিস্থিতিতে খাদ্য শস্যে উদ্বৃত্ত এ জেলার কৃষকরা এ বছর খাবার খোরাকি গোলায় তোলার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন।

এদিকে, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্কতা ভারী বৃষ্টিপাত থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা কৃষকদের মনে শঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কোন কোন কৃষক কিছু পরিমান জমির ধান কাটতে পারলেও টানা বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা ধান শোকাতে না পারায় নতুন ধানে ধান বীজে অঙ্কুরিত হচ্ছে।

জেলার ১২টি উপজেলায় সাড়ে ৮০০ হারভেস্টার ধান কাটছে বলে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দাবি করলেও কৃষকরা বলছেন হারভেস্টার পানিতে নেমে ধান কাটতে পারে না। কৃষকরা আরও জানান, জেলার দিরাই, শাল্লা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার বিশাল বিশাল হাওরের পাকা ও আধাপাকা ধান এখন বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। এসব বিশাল হাওরে নৌকা দিয়ে ধান কাটার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষায় এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার বড় ৫৩টি হাওরের ৬০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করেছে।

এসব বাঁধ নির্মণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও বরাদ্দ এসেছে ৬৭ কোটি টাকা। সূত্র আরও জানায়, মার্চ মাসে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ মিলিমিটার গড় বৃষ্টিপাত হলেও এবার মার্চ মাসে ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়াও সাধারণত এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এবার এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৮৯ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ৩২৪ মিলিমিটার, ছাতকে ৩৮৮ মিলিমিটার, তাহিরপুর উপজেলার লাউড়ের গড়ে ৪৪২ মিলিমিটার ও ধর্মপাশা উপজেলার মহেশখলায় ৪০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত অনেক বেশি।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক মন্তাজ আলী আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, দেখার হাওরে তিনি ৮ কেদার জমি চাষ করেছেন। ধান পেকেছে। ২ কেদার জমির ধান কেটে মাড়াই দিয়েছেন।

ওই ধানে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। শান্তনার জন্যই ধান শুকাচ্ছেন। একই উপজেলার নীলপুর গ্রামের কৃষানী আমিরুন্নেছা জানান, খরচাও হাওরে তিনি ৬ কেদার জমি চাষ করেছেন। ২ কেদার জমির ধান কেটেছেন। মাড়াইকরা ধানে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। বাকি ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মামুন হাওলাদার জানান, এ বছর জেলার ৫৩ হাওরের ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ৬০৩ কিলোমিটার বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্ধ পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় সুনামগঞ্জে এবার মার্চ ও এপ্রিল মাসে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানিতে হাওর,খাল-বিল ভরে গেছে। এ কারণে বৃষ্টির পানিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা আরও জানান, গত বছর মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৫৪ মিলিমিটার। আর এবছর একই সময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৫৪ মিলিমিটার। এছাড়াও এবছর এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এবার এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৮৯ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ৩২৪ মিলিমিটার, ছাতকে ৩৮৮ মিলিমিটার, তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড়ে ৪৪২ মিলিমিটার ও ধর্মপাশা উপজেলার মহেশখলায় ৪০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত অনেক বেশি।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে প্রতিটি উপজেলার হাওরের নিচু জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ জমি কাটা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জেলায় সাড়ে ৮০০ হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। তবে, জমিতে পানি জমে থাকায় ও বৃষ্টিপাতের কারণে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে কিছুটা প্রতিবন্ধতকা দেখা দিয়েছে।

ওমর ফারুক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করতে প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা জেলায় জমা দিবেন। জেলা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে।