জীবন সংগ্রামে হার না মানা তিতাসের পাঁচ অদম্য নারী
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
তাজুল ইসলাম, তিতাস (কুমিল্লা)

অর্থনৈতিক বা শিক্ষা ও চাকুরিতে অথবা সমাজ উন্নয়নে, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে কিংবা সফল জননী হিসাবে এগিয়ে চলা ৫ নারী জীবনযুদ্ধের বাকিটা সময়ে হার মানতে নারাজ। এমনটাই জানালেন, কুমিল্লার তিতাসে এবারের ‘অদম্য নারী’ শীর্ষক কার্যক্রমের সেরা নারী হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া মোসা. ফাতেমা আক্তার, আফরোজা পারভীন, আরিফা আক্তার, রাজিয়া সুলতানা ও তানিয়া আক্তার। মনোবল, অদম্য সাহস, সততা আর আপন কর্মের মাধ্যমে তারা এলাকায় হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয় গল্প। জন্ম থেকে অদ্যবধি চলমান জীবনের ঘানি টানতে টানতে অনেকটা ক্লান্ত হলেও সফলতার প্রাপ্তি ঘেরা জীবনকে অনেকটা স্বার্থক বলেই অভিহিত করেন এ পাঁচ অদম্য নারী। কথোপকথনে বেরিয়ে এসেছে তাদের জীবনের নীরব সংগ্রামের ইতিহাস।
ফাতেমা আক্তার : ৮০ দশকের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে কিছু কিছু পরিবারের আর্থিক অবস্থার চিত্র ফুটে উঠে। পরিবারগুলো অনেকটা হিসাব কর্ষে চলতে হতো। আয়ের উপর বেশি নির্ভর করতো ব্যয়। তবে এলাকার বেশিভাগ পরিবারের যে কোনো সদস্য প্রবাসে থাকলে সেই পরিবারগুলো একটু ভালো চলতো। তবে আমার পরিবারের বাবা ছাড়া কেউ ছিল না। জীবনের শেষ বেলাতে এসে সফল জননী হিসেবে স্বাকৃতি পাওয়া মোসা. ফাতেমা আক্তার এভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুধু আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় এসএসসি পাশের পরই বাবা আমাকে কলাকান্দি গ্রামের মোহাম্মদ মাসুদ ইকবালের সঙ্গে বিয়ে দেয়। পরবর্তীতে স্বামীর অনুপ্রেরণায় আমি স্নাতক (বিএ) সম্পন্ন করি। সংসারের আয়ের ধারায় গতি আনতে ১৯৯৯ সালে উপজেলা সদরে অবস্থিত ইভা কিন্ডার গার্টেনে সহকারী শিক্ষিকা হিসাবে যোগদান করলেও বর্তমানে প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে কর্মরত আছি। তিনি গর্বের সঙ্গে আমার ছোট্ট সংসার। এক ছেলে এক মেয়ে। বড় মেয়ে বর্তমানে ফার্মাসিস্ট হিসাবে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত আছে। ছেলে আরিফুল হক আবির বর্তমানে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সের ৫ম বর্ষে অধ্যয়নরত।
আফরোজা পারভীন : আপনি বড় লোক হন কিংবা খুব গবীর হন, একটা জায়গাতে আত্মতৃপ্তি থাকতে হয়। আর সে জায়গাটি হলো কাউকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া অথবা গোপনে সাহায্য করা। বর্তমানে দান করার প্রবণতা একটু কেমন জানি ফেসবুক নির্ভর হয়ে গেছে। কিন্তু যাদের বিবেক আছে; জ্ঞান আছে তারা তো কোথাও না কোথাও নিজের মধ্যে একটি আত্মতৃপ্তি বয়ে বেড়াতে হয়। শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আফরোজা পারভীন এভাবেই তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, ১৯৯৩ সালে বিএ পাশ করার কিছু দিনের মধ্যেই সাম এসোসিয়েশনের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারে চাকুরিরত মাজহারুল হক সরকারের সঙ্গে। বর্তমানে অবসরে স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী। বড় মেয়ে যমুনা ব্যাংকের অফিসার পদে মহাখালী শাখায় কর্মরত। ছোট মেয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে এমবিএ অধ্যায়নরত এবং একমাত্র ছেলে ঢাকা নর্থ সাউথ ভার্সিটি থেকে সিএসই শেষ করে স্টুডেন্ট ভিসায় বাইরে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, ১৯৯৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসাবে চাকুরিতে যোগদান। বর্তমানে চারটি বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন শেষে এই পেশাই আছি। ঐযে, বললাম, নিজের মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তি কাজ করতে হয়। আর সেটি হলোতে আমি খুব জীবনকে উপভোগ করি।
আমি আমার বিদ্যালয়ের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে গতবার শীতের কাপড় দিয়েছি, ব্যক্তিগত হতবিল থেকে প্রতি মাসে ৩ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে একহাজার টাকা করে দিচ্ছি। আমি রোটারি ক্লাবের সদস্য হওয়ায় ক্লাবের মাধ্যমেও গরিব ও অসহায় মানুষকে অনুদান প্রদান করেছি। আসলে আমি, আমার অনুদান প্রদান বা সহযোগিতার গল্পটা প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। কিছু বিষয় গোপন রাখতে হয়। তবে আমি যেন আমার অবসরকালীন সময়ে অন্যের সহযোগিতা ও সহমর্মিতায় কাজ করতে পারি সে দোয়া করবেন।
রাজিয়া সুলতানা : দুই বোন ও এক ভাইয়ের পরিবারের থেকে বাবা মাহবুবুর রহমান পরকালে চলে যান; তখন আমি খুব ছোট। আমার বড় একবোন ও ভাই। তবে এই সংসারে বাবার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে আমার বড় বোন। তার আর্থিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আজকে আমি শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী অদম্য নারী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি।
আজ বাবা থাকলে অনেক খুশি হতেন। বলতে বলতে চোখের কোণে ভারি হয়ে জমে থাকা দুফোটা অশ্রু নিজের হাত দিয়েই মুছে নেন। নিজেকে স্বাভাবিক করে বলেন, আমার বড় বোন প্রথম প্রাইভেট দিয়ে শুরু করেন। নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রচুর প্রাইভেট পড়াতেন। আর বিশেষ করে ঔ প্রাইভেটের টাকায় আমরা দুই ভাইবোন নিজেকে এগিয়ে নিয়েছি। বোনের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
তিনি তার সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে জানান, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা টেলেন্টপুলে বৃত্তিসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলাম। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়ে ছিলাম। ২০১৮ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৫৯তম মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং আল্লাহর রহমতে ফাইনাল পাস করে আজ আমি ডা. রাজিয়া সুলতানা। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এর্ন্টানশিপ চলাকালীন সময়ই আমি ৪৮তম বিসিএসও সুপারিশপ্রাপ্ত হই, যা আমার জীবনের আরেকটি বড় অর্জন ছিল। যার দাবিদার আমি না, আমার বড় বোন, আমার বড় ভাই ও আমার মা।
আরিফা খাতুন : ছোটবেলায় খুব ইচ্ছা ছিল, দেশের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে বংশের প্রদীপ জ্বালাব। কিন্তু ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বাবার আর্থিক অবস্থা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। তখনকার সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া তেমন আগ্রহী ছিল না পরিবার। তারপরও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছিলাম। নিজ পোল্টি খামারে খাবার বিতরণের সময় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী আরিফা খাতুন এভাবে তার মনের কথাগুলো অবলীলায় বলে যাচ্ছেন।
একটু থেমে ফের আবার বলতে শুরু করলেন, এখন এই খামার আমার ঘর-সংসার; হাঁস-মুরগিগুলো আমার পরিবারের সদস্য। শুষ্ক মৌসুমে এই খামারের আয় থেকে কৃষি কাজ করে থাকি। আবার বর্ষা মৌসুমে খামারই হয়ে উঠে আমার সঙ্গী। বর্তমানে খামারে এক হাজারের বেশি পোল্টি মুরগি আছে। আমার দেশি হাঁসের পাল দেখলে অনেকে হেসে উপহাস করেন। আমার কোনো কষ্ট লাগে না। যদি স্বাবলম্বী হওয়ার এই ক্ষেত্রে গায়ে কষ্ট লাগাই তাহলে উপজেলা থেকে খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করতো না। একজন সফল নারী হিসাবে স্বীকৃতি দিত না।
তানিয়া আক্তার : আমার বয়স তেমন হয়নি; ১৯৯৬ সালে জন্ম। এই ক্ষুদ্র জীবনে কেন জানি মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার জন্মই যেন আজন্ম পাপ। নির্যাতন দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামের এগিয়ে চলা তানিয়া আক্তার কথাগুলো বলতে গিয়ে একটা অনুরোধ করেন। যেন তার স্বামীকে নিয়ে কোন প্রশ্ন না করি।
স্থানীয় কিন্ডার গার্টেনে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নরত একমাত্র ছেলে দিকে তাকিয়ে তানিয়া আক্তার বলেন, অতীত আমার জীবনে অতীত হয়ে গেছে, এই ছেলেটা দেখছেন এটাই আমার ভবিষ্যৎ। এই যুগেও যে স্বামী, শশুড়-শাশুড়ি দ্বারা স্ত্রীকে নির্যাতিত হতে হয়, তাহলে সমাজ পরিবর্তন হবে আর কবে? উপজেলার দ্বিতীয় দশানীপাড়া বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া তানিয়া আক্তার বর্তমানে স্থানীয় একটি কিন্ডার গার্টেনে সহকারী শিক্ষিকা হিসাবে কর্মরত আছে। পাশাপাশি তিনি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত।
ডির্ভোসের আট বছর অতিবাহিত হচ্ছে, বিয়ে করছেন না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তানিয়া আক্তার বলেন, একটা নরক থেকে পরিত্রাণ পেয়ে আরেকটা নরকের সৃষ্টি করতে চাই না। দ্বিতীয় সংসারটি প্রথম সংসারের চেয়ে ভালো হবে সেটাও তো গ্যারান্টি নেই। তাই আর সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে আমি যে বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে এসেছি এমনটা যেন কারও জীবনে না ঘটে।
এ ব্যাপারে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রেহেনা বেগম বলেন, পুরুষ শাষিত সমাজের সব বাঁধা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবন সংগ্রামে নারীরা জয়ী হতে পারে তাই প্রমাণ করল এ পাঁচ অদম্য নারী। তিনি আরও বলেন, জীবনের বাঁধা বিপত্তিকে ঠেলে দৃঢ় মনোবল আর কর্মস্পৃহা নিয়ে কাজ করলে সফলতা অবশ্যই আসবে। অদম্য নারী ফাতেমা আক্তার, আফরোজা পারভীন, রাজিয়া সুলতানা, আরিফা খাতুন ও তানিয়া আক্তার সেটাই প্রমাণ করেছেন।
