পানিতে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন, হাওর পাড়ে হাহাকার

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নেত্রকোনা প্রতিনিধি

গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি সমতলেও দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। উঠতি বোরো ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকের স্বপ্ন বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে।

জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দার পাশাপাশি অন্য ছয়টি উপজেলার বোরো জমিতে পানি জমে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। হাওর পাড়ের কয়েক লাখ কৃষক পরিবারের মাঝে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে গেছে হাওরাঞ্চলের কৃষকে স্বপ্ন।

অন্যদিকে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধিতে নেত্রকোনার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যা দেখা দিয়েছে। হাওরাঞ্চলে কৃষকের একমাত্র বোরো ফসলের বেশির ভাগ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের সারা বছরের সংসার খরচ, কৃষিকাজ জীবন-জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি সমতলের মানুষেরও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ঋণ করে ধান চাষ করা কৃষকের বোরো ফসল হারিয়ে এখন এত টাকা খরচ করে ধানকাটার টাকাও তাদের হাতে নেই। ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা। এই ফসল হারিয়ে অনেক কৃষিজীবী পরিবারই এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। কৃষক জমিতে অবশিষ্ট পাকা ধান কাটার ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট, জ্বালানি তেলের অভাব ও প্রতিকূল আবহাওয়া ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান ঘরে তোলার সময়টুকুও কৃষকরা পাচ্ছেন না। প্রতিটি কৃষক পরিবারে এখন শুধু হাহাকার আর উৎকণ্ঠা মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে জানান স্থানীয়রা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেল ৩টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দার উদ্ধাখালী নদীর পানি ০.৬৪ মিটার খালিয়াজুরীতে ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ১ মিটার নীচ দিয়ে, জারিয়া পয়েন্টে কংশ নদীর পানি ০. ৮৯ মিটার উপর দিয়ে, আটপাড়ায় মগড়া নদীর পানি ১. ৩৬ মিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মোহনগঞ্জের দৌলতপুর গ্রামের কৃষক আজিজুল বলেন, ৫০ কাটা জমিতে বোরোর চাষ করেছিলাম। অধাপাকা থাকতে জমিতে পানি লাগায় কাটতে পারছি না। পানির নিচে পাকা ও আধাপাকা ধান আছে তা কাটানোর জন্য প্রতি কাটায় শ্রমিককে ১৮০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়াও ধান কাটার পড়ে তা নৌকা দিয়ে বাড়ি আনতে আরও টাকা খরচ লাগে। এতে করে প্রতি ১ কাটা জমির ধান কারতে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়।

আটপাড়ার দৌলতপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল বলেন, দার দেনা করে ৪০ কাটা জমিতে ধান চাষ করছিলাম। অসময়ে বৃষ্টির পানি অর্ধেকের বেশি জমির ফসল পানিতে তলাইয়া গেছে। এখন কি করব ভাইবা পাইতাছি না। সারা বছর সংসার খরচ কীভাবে চালাইব এর কোনো পথ দেখতাছি না।

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, জেলায় হাওরাঞ্চলের মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টোর এর মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে ১১ হাজার ৫২২ হেক্টোর জমি। যদি আবহাওয়ার উন্নতি ঘটে তা হলে এই সংখ্যা কিছু কমতে পারে। তবে সরকারী হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি জমি পানির নিচেয় আছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

নেত্রকোনা পানি উন্নায়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রবাহিত হচ্ছে এবং কংশ নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার উদ্ধাখালী নদীর পানি ৬৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির এই ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলগুলোকে আরও ঝুঁকিতে পড়বে।