বন্যায় নেত্রকোনার বোরো ধানের ক্ষতি ৩৭২ কোটি টাকা

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নেত্রকোনা প্রতিনিধি

খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনা। কিন্তু এ বছর আগাম বর্ষা আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে সৃষ্ট বন্যা ও জলাবদ্ধতায় জেলার হাওরজুড়ে কৃষকদের মাঝে এখন বিরাজ করছে হাহাকার। চরম দুর্ভোগ আর দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারগুলোতে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার কৃষকের শত শত হেক্টর বোরো ধানে পাকা ফসল। একমাত্র পাকা বোরো ধানের উপর এখন দুই হাত সমান অথৈজল। এখন জেলায় বোরো ধান কর্তনের বাকি ১৫ শতাংশ। হাওরের জমির ফসল কাটার আগেই পানিতে নিমজ্জিত, কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলার ১০ উপজেলার মোট প্রায় ৭৮ হাজার কৃষকের বোরো ফসলে আঘাত হেনেছে পানি। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

ধান কাটার ঠিক সময়েই টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক দিনের ব্যবধানে জেলার একের পর এক হাওর তলিয়ে যায়। যে মাঠে সোনালি ধান দোলার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু থৈ থৈ পানি। কৃষকরা শেষ চেষ্টা হিসেবে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ নৌকায় করে ধান তুলছেন, আবার কেউ ভেজা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে অনেক ধান এরইমধ্যে পচে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনার হাওরগুলোতে এখন কৃষকদের একটি চেষ্টা শুধু বছরের খোরাকের ধান সংগ্রহ করার। খালিয়াজুরি উপজেলার কৃষক আবুল কালাম বলেন, এবার ধারদেনা করে জমি লাগিয়েছি; কিন্তু বন্যা হঠাৎ করে আসলো আর চোখের সামনে ডুবিয়ে নিল পরিবারের সারা বছরের নানা হিসাব-নিকাশের স্বপ্ন। এখন শুধু পানিতে নেমে পচাগলা কিছু ধান খাবারের জন্য তুলে আনার চেষ্টা করছি।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলার ১০ উপজেলায় ৭৭ হাজার ৩৬৩ জন কৃষকের ১৬ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টিতে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছিল ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এতে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন ধান। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। শুধু হাওরাঞ্চলেই বোরো ধান আবাদ হয়েছিল ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে। সেখানে ৩৮ হাজার ২৩৮ জন কৃষকের ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে হাওরাঞ্চলে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৪৮ হাজার ২৭১ দশমিক ৫০ টন ধান, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কয়েকদিন আগেও যেখানে পাকা ধানে ভরে ছিল মাঠ, সেখানে এখন শুধু পানি আর হতাশা। কৃষকরা যা ধান উদ্ধার করতে পারছেন, তাতেও মিলছে না ন্যায্যমূল্য। ফলে একদিকে ফসলহানি, অন্যদিকে বাজার সংকটে চরম চাপে পড়েছেন তারা।

এ অবস্থায় ‘হাওরের কৃষকের কান্না থামবে কবে’ স্লোগানে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ কৃষকরা। বিক্ষোভ থেকে তারা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেত্রী জেলার মোহনগঞ্জের মল্লিকপুর হাওরের বাসিন্দা জলি তালুকদার বলেন, শুরু থেকেই হাওরের মানুষকে ঠাকানো হচ্ছে, তার মধ্যে বিএডিসির বীজ বিক্রিতে অনিয়ম করা হয়, আগাম ফলনের আশায় কৃষকরা যে বীজ নিয়েছে, সেটি ধান হওয়ার পর দেখা গেল অন্য বীজ, এ নিয়ে কৃষকরা দুর্ভোগে পড়ে। এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন। এছাড়াও তিনি সরকারি-বেসরকারি ও এনজিও ঋণ মওকুফ, হাওরের ইজারা ব্যবস্থা বাতিল, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পশুখাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষে চান।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত শ্রমিক সংকট নিরসন, আর্থিক সহায়তা এবং ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।