চান্দিনায় সবজি চাষে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন কৃষক

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

প্রকৃতির মেজাজ বোঝা বড় দায়। কখনো তীব্র খরা, আবার কখনো অসময়ের অতিবৃষ্টি কৃষকের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় নিমিষেই। সাম্প্রতিক সময়ে টানা বর্ষণে যখন এলাকার অধিকাংশ কৃষকের সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ঠিক তখনই ভিন্ন এক দৃশ্য দেখা গেল কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামে। যেখানে বুকভরা আশা আর কঠোর পরিশ্রমে এক সফলতার গল্প বুনেছেন স্থানীয় কৃষক বিল্লাল হোসেন। নিজের দূরদর্শিতা আর মাটির সঠিক ব্যবহারে তিনি আজ শুধু মেহার গ্রামেই নন, পুরো উপজেলার চাষীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

বিল্লাল হোসেন তার মাত্র ২৪ শতাংশ জমিতে এবার চাষ করেছিলেন ঢেঁড়স ও ধুন্দল। চাষাবাদের শুরুতে বড় কোনো লক্ষ্য বা জাঁকজমক ছিল না, ছিল কেবল সততা আর পরিশ্রমের একাগ্রতা। মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি এই জমিতে সবজি চাষের কাজ শুরু করেন। বীজ বপন, জমি প্রস্তুত করা আর নিয়মিত পরিচর্যার পেছনে ব্যয় করেছেন দিনরাত। মেধার আর শ্রমের সেই বিনিয়োগ আজ তাকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। তার ক্ষেতজুড়ে এখন ঝুলছে সবুজ ধুন্দল আর সারি সারি ঢেঁড়স। গাছের সবুজ পাতা আর সতেজ সবজি যেন তার ঘামের ফোঁটাগুলোকে সার্থক করে তুলেছে।

অথচ এই সাফল্যের পথটা এত সহজ ছিল না। চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে এলাকার নিচু জমিগুলো প্লাবিত হয়ে পড়ে। বহু খামারি ও কৃষকের কষ্টের সবজি ক্ষেত চোখের পলকে পচে নষ্ট হয়ে যায়। চারদিকে যখন লোকসানের হাহাকার, তখন বিল্লাল হোসেনের ক্ষেতটি ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। এর পেছনে লুকিয়ে ছিল তার এক চমৎকার দূরদর্শিতা। বিল্লাল হোসেন জানান, তিনি তার সবজি চাষের জন্য তুলনামূলকভাবে কিছুটা উঁচু জায়গা নির্বাচন করেছিলেন। এই সামান্য সিদ্ধান্তই আজ তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। চারপাশের জমি পানিতে ডুবলেও তার উঁচু ক্ষেতটি পানি নিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থার কারণে বেঁচে যায়। ফলে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণও তার ফসলের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।

বর্তমানে বিল্লাল হোসেনের ক্ষেতের ঢেঁড়স ও ধুন্দল স্থানীয় বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাজারে এখন সবজির চাহিদা প্রচুর, আর সেই তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দামও মিলছে বেশ চড়া। বর্তমানে তিনি পাইকারি দরে প্রতি কেজি ঢেঁড়স ও ধুন্দল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ক্ষেতের মান ও ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে এর কদরও অনেক বেশি।

সবজি বিক্রির এই ধুম দেখে বিল্লাল হোসেনের চোখে-মুখে এখন কেবলই তৃপ্তির হাসি। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে এই সফল চাষী জানান, চারপাশের মানুষের ফসল নষ্ট হতে দেখে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তার ক্ষেতটি উঁচু হওয়ায় রক্ষা পেয়েছে। সবজির বর্তমান বাজারমূল্য এবং ফলন, দুই-ই তার প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী , সব খরচ বাদ দিয়ে এবার তার মূল পুঁজির চেয়ে অন্তত দুই থেকে তিন গুণ বেশি লাভ হবে। এই লাভ শুধু তার আর্থিক স্বচ্ছলতাই আনবে না, বরং আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার সাহস জোগাবে।

চান্দিনার মেহার গ্রামের বিল্লাল হোসেনের এই গল্পটি আমাদের কৃষিখাতের একটি দারুণ উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক স্থান নির্বাচন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে, বিল্লাল তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন চাষাবাদ দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন উঁচু জমিতে পরিকল্পিত সবজি চাষ করে বিল্লাল হোসেন গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে এখন মেহার গ্রামসহ আশেপাশের অনেক বেকার যুবক ও সাধারণ কৃষক আধুনিক ও কৌশলগত সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। বিল্লাল হোসেনের মতো পরিশ্রমী ও দূরদর্শী কৃষকদের হাত ধরেই বেঁচে থাকে আমাদের দেশের কৃষি, সমৃদ্ধ হয় আমাদের অর্থনীতি।