বিনা খরচে মিলছে প্রতিকার, স্বস্তি ফিরছে সাধারণ মানুষের জীবনে
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মেহেদী হাসান (রায়পুর) লক্ষীপুর

একসময় জায়গা-জমি কিংবা পারিবারিক বিরোধের সমাধান মানেই ছিল কোর্ট-কাচারির দীর্ঘ প্রক্রিয়া, বছরের পর বছর মামলা চালান আর হাজার হাজার টাকা খরচের ভয়। ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষকে ঘুরতে হতো বিভিন্ন দপ্তরে।
অনেকেই অর্থাভাবে কিংবা হয়রানির ভয়ে বিচার চাওয়ার সাহসই করতেন না। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গণশুনানিকে কেন্দ্র করে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় প্রতি বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়া গণশুনানি এখন অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। যেখানে কোনো ধরনের খরচ ছাড়াই মানুষ তাদের অভিযোগ তুলে ধরতে পারছেন এবং দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন। প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
প্রতি বুধবার সকাল থেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ আসেন জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে, কেউ পারিবারিক কলহের সমাধান চাইতে, আবার কেউ সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে হাজির হন। আদালতে মামলা করলে যেসব সমস্যার সমাধানে বছরের পর বছর সময় লেগে যেত, সেসব অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে গণশুনানিতে।
এমনই একজন পৌরসভার পূর্বলাচ গ্রামের ভুক্তভোগী ছাবিকুন নাহার মিম। দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর বড় ভাইয়ের সঙ্গে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিকার পাননি। শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছারের গণশুনানিতে অভিযোগ করেন তিনি।
বুধবারের শুনানিতে উভয় পক্ষকে ডেকে বিস্তারিত কথা শোনেন ইউএনও। পরে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন তিনি। দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন হওয়ায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ছাবিকুন নাহার মিম। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে খুব কষ্টে ছিলাম। গ্রামে অনেকের কাছে গেছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। ইউএনও স্যার আমাদের কথা শুনে দ্রুত বিচার করেছেন। আমি খুব খুশি এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।
গণশুনানিতে আসা আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, আগে ছোটখাটো বিরোধ নিয়েও আদালতে যেতে হতো। মামলা পরিচালনায় আইনজীবীর খরচ, যাতায়াত ব্যয় ও সময় নষ্ট হয়ে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এখন উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ তাদের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, আমি চেষ্টা করি খেটে খাওয়া মানুষগুলো যেন হয়রানির শিকার না হয়। যেসব অভিযোগ আমার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার সুযোগ আছে, সেগুলো উভয় পক্ষকে ডেকে দ্রুত সমাধান করে দেই। আর যেসব বিষয়ে আমাদের এখতিয়ার নেই, সেসব ক্ষেত্রে কোথায় গেলে মানুষ সহজে প্রতিকার পাবে সেটিও বুঝিয়ে দেই।
তিনি আরও বলেন, গত বুধবারের গণশুনানিতেই ২৩টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছি। কিছু অভিযোগ আমরা স্থানীয়ভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করেছি। সাধারণ মানুষ যেন বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হয়রানির শিকার না হয়, কোর্ট-কাচারিতে ঘুরে টাকা-পয়সা নষ্ট না হয়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।
সাংবাদিক এমআর সুমন বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দ্রুত বিচার না পাওয়া।
একটি ছোট সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে মানুষকে বছরের পর বছর কোর্টে ঘুরতে হয়। কিন্তু রায়পুরে ইউএনও’র এই গণশুনানি কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো তৈরি করেছে। এখানে মানুষ বিনা খরচে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক সমাধানও মিলছে।
প্রশাসনের এমন মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
রায়পুর সরকারি কলেজের শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, গ্রামীণ সমাজে ছোট ছোট বিরোধ বড় আকার ধারণ করে অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের কারণে অনেক বিরোধ স্থানীয়ভাবেই সমাধান হচ্ছে। এতে মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর জর্জ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া বলেন, সব সমস্যার সমাধান আদালতে যেতে হবে এমন নয়। অনেক বিরোধ প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে সমাধান সম্ভব। ইউএনও’র গণশুনানি কার্যক্রম আদালতের ওপর চাপ কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। দ্রুত নিষ্পত্তির কারণে সাধারণ মানুষও উপকৃত হচ্ছেন।
সমাজকর্মী আবদুল কাদের পাটোয়ারী বলেন, গ্রামের অসহায় মানুষ অনেক সময় টাকার অভাবে আইনি লড়াই চালাতে পারেন না। ফলে তারা নীরবে অন্যায় সহ্য করেন। এখন ইউএনও’র গণশুনানির কারণে মানুষ সহজেই প্রশাসনের কাছে যেতে পারছেন। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও সাহস তৈরি করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, উপজেলা পর্যায়ে এমন গণশুনানি কার্যক্রম নিয়মিত ও আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে সামাজিক বিরোধ অনেকাংশে কমে আসবে। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না।
মানুষের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দিতে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান কাউছারের এই উদ্যোগ এরইমধ্যে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। অনেকের কাছে এখন ইউএনও’র গণশুনানিই হয়ে উঠেছে অসহায় মানুষের শেষ ভরসার জায়গা।
