টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নওগাঁর ১৩ জনের বাড়িতে শোক
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের যুবক আব্দুল বারিক (২২)। পেশায় হরেক রকম (প্লাস্টিক পণ্যের বিনিময়ে চুল কেনা) পণ্যের ব্যবসায়ী। এক বছর আগে বিয়ে করেন পাশের বাদলঘাটা গ্রামে মারুফা খাতুনকে। গত ২২ দিন আগে স্ত্রীকে তার বাবার বাড়ি রেখে জীবিকার তাগিদে ব্যবসার জন্য গিয়েছিলেন নোয়াখালী জেলায়।
পরিবারের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করতে একটি রডবাহী ট্রাক যোগে অন্তত ২৬ জন হরেক মালের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে গতকাল সোমবার ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে উল্টে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। একই সঙ্গে মান্দা থানার ১৩ জন মারা যান।
নিহত আব্দুল বারিকের স্ত্রী মারুফা খাতুন বলেন- গত রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তখন বাবার বাড়িতে ছিলাম। স্বামীর সঙ্গে কথা ছিল ব্যবসা থেকে ফিরে একসঙ্গে স্বামীর বাড়ি যাব। কিন্তু তার সঙ্গে আমার আর স্বামীর বাড়ি যাওয়া হলো না ? দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ নিজের স্বামীর বাড়িতে আসতে হলো বলে আহাজারি করে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন তিনি। স্বজনরা তাকে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ছেলের শোকে মা ময়না বেগমও পাগলপ্রায় অবস্থা। কান্না আর বিলাপ করছেন তিনি। ছেলে শোকে পাগলপ্রায় অবস্থা কথাও বলতে পারছেন না। স্বজনরা তাকে পাখার বাতাস করে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই অবস্থা জেলার মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া ও মজিদপুর গ্রামের। রাজেন্দ্রবাটি এক গ্রামেই অন্তত ৭ জন মারা যায়। দুর্ঘটনায় কারো বাবা, কারো, স্বামী ও সন্তান আবার কারো ভাই মারা যায়। স্বজনদের হারিয়ে কান্না করছেন। এলাকায় এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গতকাল সোমবার বিকাল ৩টার দিকে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে আসেন মান্দা উপজেলার নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী, ভারশোঁ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোাস্তাফিজুর রহমান সুমন এবং জেলা জামায়াতে আমির আব্দুল রাকীব। তারা নিহতের পরিবারে খোঁজখবর নেন ও তাদের প্রতি সমবেদনা জানান। নিহতরা হলেন- রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল বারিক (২২), তার চাচা আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৪০), সাকিম হোসেনের ছেলে সাগর হোসেন (২২), আকব্বর আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (২০), সুলতান মাহমুদের ছেলে তারেক রহমান (১৮), শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল আলম (২৮) পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে মাইনুল ইসলাম (২৮) ও তার ভাই গিয়াস উদ্দিন (২২)। হোসেনপুর গ্রামের জাফের আলীর ছেলে মাইনুল ইসলাম (৩৫) সহ ১৩ জন।
স্থানীয় ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়- নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি, পাকুড়িয়া ও হোসেনপুর দরিদ্রপ্রবন গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষ জীবিকার তাগিদে নোয়াখালী ও ফেনী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে হরেক মালের ব্যবসা করেন। এসব গ্রাম থেকে শতাধিক মানুষ ওই জেলায় গিয়ে কেউ অন্তত ১৫ দিন, ২০ দিন, ২৫ দিন বা ১ মাস ব্যবসা করতো। এরপর তারা ভালো একটা আয় করে গ্রামে আসত। কিছুদিন গ্রামে থেকে আবার ব্যবসার জন্য যেতো।
সর্বশেষ গত ২০-২৫ দিন আগে তারা নোয়াখালী যায়। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করতে কিছু টাকা বাঁচাতে একটি ট্রাক যোগে ২৬ জন বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে সোমবার ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে উল্টে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। নিহত তারেক রহমানের মা মোমেনা বেগম বলেন- রাত ৮টার দিকে ছেলের সঙ্গে কথা হয়। রাতেই তারা ট্রাকে করে রওনা দিবে। কিন্তু ছেলে আর বাড়ি ফিরল না। সকালে ফোনে জানতে পারলাম ছেলে ট্রাকের রড চাপা পড়ে মারা যায়। এ শোক কিভাবে সইবো। তারা দুই ভাই ও এক বোন, তারেক দ্বিতীয়।
ওই ঘটনায় ১৩ জন মারা যায় বলে স্বজনরা জানিয়েছে। নিহতদের লাশ দ্রুত বাড়ি ফেরানোর দাবি স্বজন ও এলাকাবাসীর। সেইসঙ্গে নিহত ও আহতদের সরকারিভাবে সহযোগিতার দাবি জানানো হয়। মান্দা উপজেলার নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী বলেন- নিহতের স্বজনা ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছেন। যেহেতু অনেকের মুখমণ্ডল চিনতে একটু সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে লাশ বুঝে নিতে দেরি হচ্ছে। তবে দেরি হওয়ায় জানাজা সম্ভবত আজ হচ্ছে না। নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন- টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা। নিহতদের বিষয়ে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের জানাজার জন্য প্রত্যেক নিহতেরর পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা সহযোগিতা করা হবে।
