গানেই শান্তি খোঁজেন লাইলি খালা শিল্পী জীবনের অজানা উপাখ্যান
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
খান লিয়াকত, ফরিদপুর

ফরিদপুর শহরের পথে-প্রান্তরে তাকে বহুদিন ধরেই দেখা যায়। কাঁধে একটি পুরোনো থলে, এলোমেলো পোশাক, মুখভরা পান খাওয়া হাসি আর চোখে এক অদ্ভুত দূরদৃষ্টি। ‘লাইলি বাউল’ কেউ তাকে বলেন ‘লাইলি খালা’, কেউ ‘লাইলি পাগলি’, আবার কেউবা ভবঘুরে শিল্পী। কিন্তু পরিচয়ের সমস্ত সামাজিক অভিধান ছাপিয়ে তিনি আসলে এক অনন্য চরিত্র মানুষ দেখা পাগল এক নারী, যার জীবন গান, পথ আর মানুষের ভিড়ে মিশে আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে।
সম্প্রতি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামণ্ডএর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী ময়েজ মঞ্জিল-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’ গান গেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন এই শিল্পী। তার কণ্ঠ, সুরের গভীরতা আর আবেগময় পরিবেশনা মুহূর্তেই মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। অথচ এই নারী কোনো প্রশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত শিল্পী নন, নেই তার কোনো অ্যালবাম, কোনো সংগীত প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রচারের আয়োজন। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি শুধু গান গেয়েছেন নিজের জন্য, মানুষের জন্য, আত্মার শান্তির জন্য।
আমল শব্দটির অর্থ কাজ। সেই অর্থে লাইলি খালার জীবনেরও একটি আমলনামা আছে। তবে সেটা কোনো আমলাতান্ত্রিক কাগজপত্র নয়; তার আমলনামা লেখা আছে মানুষের স্মৃতিতে, শহরের অলিগলিতে, মেলা-মাজারে, রেলস্টেশনে, ঘাটে আর লোকজ সংস্কৃতির মঞ্চে।
ফরিদপুর শহরের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের মানুষজন তাকে বহু বছর ধরেই চেনেন। কিন্তু তার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কখনও হাড়োকান্দীতে ছেলের বাড়িতে, কখনও ঝিলটুলীর কোনো পরিচিত বাড়িতে, কখনও মাজারে, আবার কখনও পথেই রাত কাটে তার। সংসারের গণ্ডি তাকে কোনোদিন বেঁধে রাখতে পারেনি।
লাইলি বেগমের বয়স এখন প্রায় ৬৫। তিনি ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকার মৃত শেখ ইসলামের প্রথম স্ত্রী। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জননী। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার পর ধীরে ধীরে সংসার থেকে দূরে সরে যান তিনি। পরে ২০১৫ সালে স্বামী ক্যানসারে মারা গেলে শেষবারের মতো ছুটে এসেছিলেন বাড়িতে। কিন্তু স্থায়ীভাবে আর সংসারে ফেরেননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৫ বছর ধরেই তিনি ভবঘুরে জীবন বেছে নিয়েছেন। কোথাও বেশিদিন থাকেন না। কোনো মেলা, গানের আসর বা আধ্যাত্মিক আয়োজনের খবর পেলেই ছুটে যান সেখানে।
লাইলি খালার সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিচয় তার দর্শন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন এভাবে ঘুরে বেড়ান?
উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই।
এই একটি বাক্য যেন তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারাংশ। তিনি মানুষের ভিড়ে ঘুরে বেড়ান, মানুষের মুখ পড়েন, মানুষের আচরণ দেখেন। তার কাছে পৃথিবী এক চলমান নাট্যমঞ্চ।
হাটে, নৌকা ঘাটে, রেলস্টেশনে কিংবা লোকজ মেলায় মানুষের ভিড় দেখলেই সেখানে হাজির হন তিনি। শুধু মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, রামকীর্তন, রথের মেলা, ওরস- সব জায়গাতেই তার অবাধ বিচরণ। স্থানীয়রা জানান, আধ্যাত্মিক টানে একসময় কোনো পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই হেঁটে ভারতের আজমির শরীফ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন তিনি। তার কাছে ভৌগোলিক সীমান্তের চেয়ে মানুষের সম্পর্ক আর আধ্যাত্মিক টানই বড়।
লাইলি বাউল জানান, ছোটবেলায় তার মা-ই তাকে গান শিখিয়েছিলেন। এমনকি একটি হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই গান, নাচ ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক ছিল তার।
বিয়ের পরও গান ছাড়েননি। যদিও সামাজিক বাধা ছিল, পারিবারিক অস্বস্তিও ছিল। কিন্তু গান যেন তার আত্মার অংশ হয়ে ওঠে।
তিনি লোকগান, বাউল, কাওয়ালি, মারফতি, লালনগীতি, নজরুলগীতি এমনকি উর্দু গানও গাইতে পারেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা জানান, তিনি একসময় বিখ্যাত শিল্পী মেহেদী হাসান-এর গজল এবং রুনা লায়লা-র পুরোনো উর্দু গানও অসাধারণ দক্ষতায় পরিবেশন করতেন।
ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির সাবেক এক সংগঠক স্মৃতিচারণ করে বলেন, শুরুতে প্রায় প্রতিদিন বিকালে লাইলি এসে বলতেন- ‘স্যার, একটা গান শোনাই।’ অনেক সময় বিরক্তিও লাগত। কিন্তু একদিন জোর করেই তিনি মেহেদী হাসানের একটি গজল শোনান। তারপর রুনা লায়লার গাওয়া উর্দু গান গেয়ে সবাইকে বিস্মিত করে দেন।
সেই থেকেই ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। একসময় তিনি আবদার করেন আমারে হারমোনি শিহেবেন না?
স্থানীয় সংগীতশিক্ষকদের অনুরোধ করা হয় তাকে একটু শেখানোর জন্য। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, খুব দ্রুতই তিনি নিজে নিজেই সুর ধরতে শেখেন। পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতে শুরু করেন।
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের নানা আয়োজনে তিনি হয়ে ওঠেন অপরিহার্য মুখ। ২০০৩ সালে পল্লীকবি জসীম উদ্দীন-এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি গান গেয়ে ব্যাপক প্রশংসা পান।
সেই অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন জালাল আহমেদ। তার পক্ষ থেকে লাইলিকে শাড়ি উপহার দেওয়া হয়। সেই স্মৃতি লাইলি বহুদিন ধরে গর্ব করে সবার কাছে বলতেন- ‘ডিসি আমার গান শুনে কাপড় দিছে।’ গত ২৪ মে ফরিদপুরে নজরুল জন্মোৎসবের অনুষ্ঠানে লাইলি খালার গান যেন নতুনভাবে তাকে আবিষ্কার করায় দেশবাসীর কাছে। মঞ্চে বসে থাকা অতিথিদের অনুরোধে তিনি গান ধরেন- ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার...। মুহূর্তেই অনুষ্ঠানস্থলে নেমে আসে এক অন্যরকম আবহ। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনেন তার গান।
সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যান তিনি। ফেসবুকজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। মানুষ জানতে চায়- কে এই লাইলি খালা?
কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পরও তার জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনও তিনি আগের মতোই পথে পথে ঘুরে বেড়ান।
লাইলি বেগমের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তিনি গানকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখেন না। তার কাছে গান আধ্যাত্মিক শক্তি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, গানই আমার জীবন। কেউ কষ্ট দিলে গান ধরে আমি চলে যাই। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। কারণ গান মানুষের আত্মার খোরাক। তিনি আরও বলেন, আমি কী ছিলাম, কেউ বুঝবে না। আমি যখন থাকব না, তখন আমার পোলাপান বুঝবে। এই কথাগুলোতে ফুটে ওঠে তার অভিমান, বঞ্চনা এবং শিল্পীর নিঃসঙ্গতা।
লাইলি খালার মতো শিল্পীরা সমাজে খুব কমই মূল্যায়ন পান। বড় মঞ্চে গান গাইলেও তারা থাকেন প্রান্তিক। একটি অনুষ্ঠানে তাকে রিকশাভাড়া বাবদ ৩০০ টাকা দেওয়া হলে তিনি ১০০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন- অতো লাগবে না, যাগো পেটে খিদে তাগো বেশি দেন। এই সরলতা আর উদাসীনতাই তাকে আলাদা করেছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে গান গাইলেও তিনি কোনো আর্থিক নিরাপত্তা পাননি। কখনও কখনও পরিবারের কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে নানা কথা। তবু গান ছাড়েননি।
