চান্দিনায় মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা একসময় যে অঞ্চলটি শুধু ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড় আর সাধারণ কৃষিকাজের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে গত কয়েক বছরে ঘটে গেছে এক বিশাল রূপান্তর। কোনো শোরগোল নেই, নেই বড় কোনো ঢাকঢোল পেটানো আয়োজন; অথচ গ্রামীণ অর্থনীতির দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে মাছ চাষ। পুকুর, ডোবা আর পতিত জলাশয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে এখানকার তরুণ ও মৎস্য চাষিরা এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করেছেন, যা এখন পুরো জেলার জন্য এক অনুকরণীয় মডেল।

কয়েক বছর আগেও চান্দিনার বহু জলাশয় কচুরিপানায় পরিপূর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত। সনাতন পদ্ধতিতে কিছু মাছ চাষ হলেও তা ছিল শুধুই নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটানোর খোরাক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রটা বদলেছে। স্থানীয় শিক্ষিত বেকার যুবকেরা চাকুরির পেছনে না ছুটে মৎস্য চাষকে বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। আর তাতেই এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল ফসলি জমির পাশে কিংবা গ্রামের ভেতরে গড়ে উঠেছে আধুনিক মৎস্য খামার।

এই বিপ্লবের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ও চাষিদের কঠোর পরিশ্রম। সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে চাষিরা এখন ঝুঁকেছেন কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ, পাঙাশ, তেলাপিয়া এবং উচ্চ মূল্যের শিং, মাগুর ও গুলশা মাছের নিবিড় চাষে। অনেকেই আবার অল্প জায়গায় অধিক ফলনের জন্য ব্যবহার করছেন ‘বায়োফ্লক’ বা ‘পুকুরে এয়ারেটর’ (অক্সিজেন সরবরাহকারী যন্ত্র) প্রযুক্তি। প্রযুক্তির এই ব্যবহারের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ, আর কমেছে মৎস্য মড়কের ঝুঁকি। চান্দিনার এই মৎস্য বিপ্লব শুধু কয়েকজন খামারির ভাগ্যবদল করেনি, এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল গতির সঞ্চার করেছে। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে উপজেলায় গড়ে উঠেছে বিশাল এক বাণিজ্যিক বলয়। ফিশ ফিড বা মাছের খাদ্যের দোকান, পোনা উৎপাদনের হ্যাচারি এবং মাছ ধরার শ্রমিকদের এক বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এখানে। প্রতিদিন ভোররাতে চান্দিনার বিভিন্ন আড়ত থেকে শত শত টন মাছ ট্রাকবোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি বাজারে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই অঞ্চলের মাছ এখন দেশের প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সাফল্যের পথটা একেবারে সহজ ছিল না। শুরুর দিকে সঠিক জ্ঞানের অভাব এবং ভালো মানের পোনা ও ফিডের উচ্চ মূল্য ছিল প্রধান বাধা। তবে উপজেলা মৎস্য অফিসের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং চাষিদের নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলে দ্রুতই তারা এই সংকট কাটিয়ে ওঠেন। বিশেষ করে করোনাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে অনেক প্রবাসী ও চাকরিচ্যুত যুবক বাড়ি ফিরে মৎস্য চাষে বিনিয়োগ করেন, যা এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

তবে এই সম্ভাবনাময় খাতের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চাষিদের মতে, বাজারে মাছের খাদ্যের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং মাঝে মধ্যে ওষুধের কৃত্রিম সংকট মুনাফার পরিমাপ কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছে। সরকারিভাবে যদি সহজ শর্তে ঋণ এবং মৎস্য খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা যায়, তবে চান্দিনার এই বিপ্লব আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।

চান্দিনার মাছ চাষের এই গল্পটি শুধু স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির গল্প। কোনো প্রকার কোলাহল ছাড়াই, নিভৃত পল্লীর ঘামে ভেজা মানুষগুলো প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সঠিক উদ্যোগ আর পরিশ্রম থাকলে মাটিকে সোনার খনিতে রূপান্তর করা সম্ভব। চান্দিনার এই রূপালী বিপ্লব আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদনে এক অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।