প্রকৌশলীদের ব্যাখ্যায় প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কালিখোলা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি সেতু প্রকল্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘খাল-নদী ছাড়াই ১২ কোটি টাকার সেতু’ শিরোনামে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রতিবেদনে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটির প্রকৌশলগত বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়গুলো যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দণ্ডফরিদপুর-তাড়াইল আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কালিখোলা এলাকায় ৪৪ মিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রশস্ত একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নবারণ ট্রেডার্স লিমিটেড।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, যেখানে নতুন সেতুটি নির্মিত হচ্ছে, সেখানে পূর্ব থেকেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত প্রায় ৩৬ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু ছিল। এলাকাটি একসময় ভুবনেশ্বর নদী থেকে উৎপন্ন গোপালপুর শাখা খালের গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহপথ হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালের দুই পাশে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় এর দৃশ্যমানতা অনেকাংশে কমে গেলেও পুরোনো প্রবাহপথের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটি কোনোভাবেই নতুন করে ডাঙার ওপর সেতু নির্মাণ নয়। বরং পুরোনো, সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর পরিবর্তে আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ জলপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সেতুর নিচে প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, সেতুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ, সড়ক নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। পাশাপাশি অ্যাবাটমেন্ট, উইং ওয়াল ও সড়কের শোল্ডার সুরক্ষার বিষয়ও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সেতু নির্মাণে কেবল বর্তমান পরিস্থিতি নয়, বরং আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের সম্ভাব্য চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে দৃশ্যমান জলপ্রবাহ সীমিত হলেও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এ ধরনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, পদ্মা অববাহিকার জেলা হিসেবে ফরিদপুরে অতীতে উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে পানি প্রবাহের সম্ভাব্য পথ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।স্থানীয়ভাবে প্রকল্পটি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও প্রকৌশলীরা বলছেন, কোনো সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কারিগরি জরিপ, নকশা মূল্যায়ন, ব্যয় বিশ্লেষণ এবং একাধিক পর্যায়ের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করা হয়। ফলে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান দৃশ্যমান অবস্থা নয়, বরং সামগ্রিক প্রকৌশল ও পরিকল্পনাগত বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে জনমত ও আলোচনা গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো প্রকল্প সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে প্রকৌশলগত তথ্য, সরকারি নথি, স্থানীয় ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলোও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কাজ শেষ হলে গোয়ালন্দণ্ডফরিদপুর-তাড়াইল আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল আরও নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।