দেয়ালে দেয়ালে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রঞ্জন কৃষ্ণ পণ্ডিত, টাঙ্গাইল

ভোর হলেই ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পড়েন তিনি। গন্তব্য অজানা। সারা দিন শহরের এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে ছুটে চলা। মুখে স্পষ্ট ভাষা নেই, নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। অথচ ১০-১৫ মিনিটের জাদুকরি ছোঁয়ায় ইটের ধূসর দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন অসাধারণ সব চিত্রকর্ম। তিনি আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে চাঁনু মিয়া (৫১)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘চাঁনু পাগলা’ নামে। মানসিক ভারসাম্যহীন এই মানুষটির তুলির আঁচড়ে মুগ্ধ এখন টাঙ্গাইল শহরের সর্বস্তরের মানুষ।
টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা চাঁনু মিয়া বাবা-মায়ের পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা চাঁনু ছোটবেলায় বাবার সাথে মাঠে কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে কচুরিপানা, মাটির টুকরো আর কয়লা দিয়ে মাটিতেই আঁকিবুঁকি করতেন। সেখান থেকেই মূলত তার ছবি আঁকার হাতেখড়ি। তবে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তীব্র একাগ্রতা আর একাকিত্ব থেকে একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই ছবি আঁকাকে নিজের জীবনের একমাত্র সঙ্গী করে নেন তিনি। চাঁনু মিয়ার আঁকা ছবির মূল আকর্ষণ এক জোড়া তরুণ-তরুণী। স্থানীয়দের ধারণা, ছবির ছেলেটি স্বয়ং চাঁনু মিয়া এবং মেয়েটি তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা। তবে সেই প্রেমিকার নাম বা পরিচয় আজও রহস্যই রয়ে গেছে। শুধু প্রেম নয়, চাঁনুর তুলিতে ফুটে ওঠে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ছবির পাশাপাশি দেয়ালে দেয়ালে তিনি লিখে রাখেন চমৎকার সব উপদেশমূলক বাণী।
পেশায় চিত্রশিল্পী না হলেও চাঁনু মিয়ার কাজের গতি ও নিখুঁত শৈলী যেকোনো পেশাদার শিল্পীকে হার মানাবে। কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটে তিনি এঁকে ফেলেন পূর্ণাঙ্গ ছবি। অস্পষ্ট ভাষায় কথা বলা এই মানুষটির ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা দেখে প্রতিনিয়ত পথচারীরা থমকে দাঁড়ান, মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন তার সৃষ্টিশীলতা। দিন শেষে অন্ধকার নামলেই আবার ফিরে যান নিজের একাকী ঘরে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁনু মিয়ার সঙ্গে একটি বস্তা। বস্তার ভেতরে কয়লা ও কচুরিপানা আর কিছু কাগজের টুকরা পাশে রেখে শহরের পার্ক বাজারের মোড়ে একটি দেয়ালে চাঁনু মিয়া ছবি আঁকছেন। তার এ ছবি আঁকা দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সি মানুষজন। আঁকা ছবি দেখে সবাই প্রশংসা করছনে। চাঁনু মিয়ার প্রায় সমবয়সী স্থানীয় বাসিন্দা রাব্বি ইসলাম বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি চাঁনু মিয়া কচুরপিানা ও কয়লা দিয়ে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আর্ট করে রাখেন। তার ছবি আঁকা খুবই সুন্দর। তার ছবি আঁকা দেখে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা উৎসাহিত হবেন।
পার্কবাজারের ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস আলী বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে দেখছি তিনি বিভিন্ন দেয়ালে গাছের পাতা, কয়লা দিয়ে ছবি আঁকেন। বিভিন্ন দেয়ালে দেখা মিলে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের ছবি, সবাই ধারণা করছে মেয়েটি তার প্রেমিকা আর ছেলেটি তিনি। এছাড়াও তিনি স্বাধীনতার ছবিও এঁকে থাকেন। তাকে যদি সরকারিভাবে সুচিকিৎসা দিয়ে সহযোগিতা করা হয়- তাহলে তিনি ভালো চিত্রশিল্পী হতে পারবেন।
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালক সেলিম মিয়া বলেন, আমি শহররে বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালাই। চাঁনু পাগলাকে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে দেখি। যখন যাত্রী না থাকে রিকশা চালানো বন্ধ করে তার ছবি আঁকা দেখি, অনেক ভালো লাগে। চাঁনু দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকেন। যে দেয়ালে ছবি আঁকেন অনেক সময় তাকে বাসার মালকিরা গালিগালাজ করেন। তারপরও চাঁনু মিয়া থেমে যাননি। তার প্রতিভাদেখে সবাই মুগ্ধ।
