‘নন্দিনী হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হবে’

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  লালমনিরহাট প্রতিনিধি

লালমনিরহাটে শিশু নন্দিনী রানী হত্যার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামের শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় দ্রুত বিচারের আশা ব্যক্ত করেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেছেন, ‘নির্মম, নৃশংস ও বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমরা তার পরিবারের কাছে এসেছি, সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানোর জন্য। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে আমরা শোকাহত নন্দিনী রানীর পিতা-মাতাসহ পরিবারের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাতে এসেছি। তিনি আরো বলেন, ‘হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। যতটুকু জেনেছি হত্যার দায় স্বীকার করেছে! পুলিশ দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবে। এরপর বিচার শুরু হবে। কোনো বিলম্ব হবে না। এসময় উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাট-১ এর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান, লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. রোকন উদ্দিন বাবুল, জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। এদিকে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার বিকেলে গ্রেপ্তার রঞ্জিত কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্রকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলাউদ্দিনের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে আসামি বিধান চন্দ্র ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জানা গেছে, এক মাস আগে ওই শিশুর বড় ভাইয়ের (১৩) সঙ্গে নলকূপের নালার পানি প্রবাহ নিয়ে বিধান চন্দ্রের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই বিরোধের জের ধরে শিশুটিকে হত্যা করেন বিধান। পরে মরদেহ বস্তায় ভরে মাটিচাপা দেন। এর আগে মঙ্গলবার সকালে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে নিজ বাড়ির পাশের ভুট্টাক্ষেত থেকে নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ওই এলাকার নলিনী কান্তের মেয়ে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার বিকেলে নন্দিনী বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশে ভুট্টাক্ষেতে পুঁতে রাখা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। ঘটনার পর অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে নিজ বাড়ি থেকে এবং তার বাবাকে পাশের একটি বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের আটকের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা আসামিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় স্থানীয়রা। এতে ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে আসা লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আসামিদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় স্থানীয়দের হামলায় পুলিশ সুপার, ওসি-সহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হন। বিক্ষুব্ধরা ডিসি ও এসপির গাড়িসহ সরকারি সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করে। ঘটনার পর পরই আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হককে প্রত্যাহার করা হয়। পরে সদর থানার ওসি (তদন্ত) নাজমুস সাকিব সজিবকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী কান্ত বাদী হয়ে বিধান, তার বাবা রণজিৎ ও মা মমতা রানীর বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় বিধান ও তার বাবাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।স্থানীয় লোকজনের দাবি, বিধান চন্দ্র পেশায় জুয়েলারি শ্রমিক হলেও মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের টাকা জোগাতে তিনি বিভিন্ন সময় চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। প্রতিবেশীরা আরো বলেন, বিধান ছোটবেলা থেকেই বেশ উগ্র স্বভাবের ছিলেন।সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতার কারণে সে নানা রকম অপরাধের জড়িয়ে পড়ে। নন্দিনীর মা সাবিত্রী রাণী বলেন, আমার বুকের ধনকে কেড়ে নিয়েছে। আমি হত্যাকারী, তার বাবা-মা সবার ফাঁসি চাই। নন্দিনীর বাবা নলিনী কান্ত বলেন, আমার মেয়েকে কেন হত্যা করা হলো, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র হত্যার দায় স্বীকার করেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে সে জানিয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি সম্পদ নষ্টের ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। যেখানে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অপরটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন পুলিশ সুপার। তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে ।