চান্দিনায় সড়কের বেহাল দশা, দুর্ভোগ চরমে

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গেই চান্দিনায় শুরু হয়েছে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও জনপথের অবস্থা এখন এতটাই শোচনীয় যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল রূপ নিয়েছে এক চরম যন্ত্রণায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার কর্দমাক্ত খানাখন্দে ভরা রাস্তা, সব মিলিয়ে পুরো উপজেলার যোগাযোগব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। এর ওপর যোগ হয়েছে চলমান সংস্কার কাজের ধীরগতি, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বৃষ্টি হলেই কাদার সমুদ্রে পরিণত হওয়া সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ এই নরকযন্ত্রণার কোনো স্থায়ী সমাধান যেন কোথাও নেই। এই চরম দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় চিত্রটি ফুটে উঠেছে চান্দিনা থেকে বদরপুর হয়ে কাদুটি পর্যন্ত সড়ক এবং মাধাইয়া-নবাবপুর সড়কে। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। বর্তমানে এই দুটি সড়কেই সংস্কার কাজ চলছে, কিন্তু সেই কাজের গতি এতটাই শ্লথ যে, সাধারণ মানুষের মনে এখন শুধুই ক্ষোভ আর হতাশা। কোথাও রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস, আবার কোথাও ইটের খোয়া ঢেলে ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘসময় ধরে। ফলে বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতেই পিচ ঢালাইবিহীন এই সড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ভ্যান তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলার উপায়টুকুও কেড়ে নিয়েছে এই ধীরগতির উন্নয়ন কাজ।

সড়কের এই কঙ্কালসার অবস্থার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু পরিবহন চালক ও সিন্ডিকেট মেতে উঠেছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের উৎসবে। রাস্তা খারাপের অজুহাত দেখিয়ে চান্দিনা-কাদুটি এবং মাধাইয়া-নবাবপুর সড়কে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটা হচ্ছে প্রতিদিন। কিলোমিটার প্রতি যে ভাড়া হওয়ার কথা, তার চেয়ে দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ ভাড়া দাবি করছেন চালকরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চালকদের যুক্তি, খারাপ রাস্তায় গাড়ি চালালে যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়, সময় বেশি লাগে এবং তেলের খরচ বাড়ে। কিন্তু তাদের এই যুক্তির বলি হতে হচ্ছে সাধারণ চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং অসহায় রোগীদের। অনেক সময় বাড়তি ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে যাত্রীদের চরম অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি চান্দিনার সর্বস্তরের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, সব শ্রেণির পেশাজীবী আজ দিশেহারা। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চালক ও সাধারণ রোগীরা। এই ভাঙাচোরা এবং খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে কোনো মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মানে জীবন-মৃত্যুর এক কঠিন পরীক্ষা। গর্ভবতী নারী ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য এই সড়কগুলো এখন এক আতঙ্কের নাম।

সামান্য কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে, যা মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট করার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, উন্নয়ন কাজের নামে যে ধীরগতির নাটক চলছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ভূমিকা না থাকায় পরিবহন চালকদের এই লাগামহীন ভাড়া নৈরাজ্য থামানো যাচ্ছে না। একদিকে ভাঙা রাস্তার কারণে যাতায়াতে দ্বিগুণ সময় লাগছে, অন্যদিকে পকেটের টাকা খোয়া যাচ্ছে দেদারসে। এই দ্বিমুখী সংকটে পড়ে চান্দিনাবাসীর পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।

একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু চান্দিনার এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বর্তমান চিত্র কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্ষার এই ভরা মৌসুমে মানুষের এই সীমাহীন কষ্টের অবসান ঘটাতে হলে আর কোনো কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি—অনতিবিলম্বে যেন এই সড়কগুলোর সংস্কার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করা হয়। একই সঙ্গে, রাস্তা খারাপের দোহাই দিয়ে যে পরিবহন নৈরাজ্য ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের উৎসব চলছে, প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে তা দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন। চান্দিনার মানুষকে এই চরম দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।