বাঁশির সুরে চলে সংসার
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নুর উল্লাহ আরিফ, চরফ্যাশন (ভোলা)

‘তুমি আর বাজাইওনা তোমার বাঁশের বাঁশি
প্রেম বিরহে বিনোদিনী কান্দে দিবানিশি।’ কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মনির খানের কালজয়ী গানের মত বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে সুরের মোহনীয়তায় পথে-প্রান্তরের মানুষকে নিজের প্রেমে ফেলে দেন সত্তোর্ধ্ব বংশীবাদক জগদীশ চন্দ্র শীল। বাঁশিতে মোহনীয় সুর তুলেই পথে-ঘাটে জীবনের ৪৮ টি বসন্ত কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি । জগদীশ চন্দ্র সকাল-দুপুর সন্ধ্যা আর রাতের নিশিতে যখন-তখনই সুর তুলেন বাঁশিতে। জীবন সায়াহ্নে এসেও থেমে নেই বাঁশিতে সুর তোলা তার। রাস্তাঘাট, বনবাদার, বাজার-বন্দরের অলি-গলিতে সুরের ঢেউ তোলায় চলে জগদীশ চন্দ্রের পরিবারের জীবিকার চাকা।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন মফস্বল বাজার-বন্দরে হেঁটে হেঁটে বাঁশিতে এমন সুর তুলছেন বংশীবাদক জগদীশ চন্দ্র শীল। বয়স ৭০ পেড়িয়ে। জীবন সায়াহ্নের পড়ন্ত বেলায়ও তোলেন বাশরীতে সুর। তার সুরের লহরীতে আবাল- বৃদ্ধবনিতাসহ শিক্ষার্থী ও পথচারীরা দাঁড়িয়ে তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হচ্ছেন।
তার বংশীর সুরের মোহিত হয়ে বাঁশি কিনছেন শ্রোতারা। বাঁশি বিক্রির টাকায় চলে এই বংশীবাদক জগদীশ চন্দ্র শীলের চার সদস্যের সংসার। বলা যায়, ‘বংশীর সুরে জীবন চলে’ এই সুর শিল্পীর। জগদীশ চন্দ্র শীলের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের আলাপ হয় কোন এক পড়ন্ত বিকেলে। তিনি জানান, বরগুনা জেলার বেতাগী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডে তার বসবাস। বাবা কৃষ্ণ চন্দ্র শীল ছিলেন একজন কৃষক। দরিদ্র পরিবারে টানাপোড়নের সংসারেই জন্ম হয় তার। অভাব-অনটনের সংসারে পড়াশুনার সুযোগ পাননি তিনি। শৈশব থেকেই বাঁশির প্রতি তার মোহ ছিলো। স্থানীয় বংশীবাদকের কাছে হয় তার বাঁশিতে সুর তোলার তালিম। যুবা বয়সেই যাত্রাদলে তিনি অংশগ্রহণ করেন। প্রায় ৭ বছর একটি যাত্রাদলে বংশীবাদক হিসেবে কাজ করেন এই ভ্রাম্যমাণ বাঁশি বিক্রেতা।
এক সময় যাত্রাদল ভেঙে গেলে কাজ হারিয়ে জগদীশ চন্দ্র শীল বেকার হয়ে পড়েন। কোথাও কাজ না পেয়ে বাঁশিতেই ফিরে আসেন তিনি। স্ত্রী রমলা রাণীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তারাও বাঁশি তৈরি করে দেন তাকে। সেই থেকেই প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে গ্রাম থেকে শহরের হাটবাজারে করেন বাঁশি বিক্রি। শহরের অলিগলি আর গ্রামের মেঠো পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাঁশিতে সুরের ঢেউ তুলেন। নিরন্তর চেষ্টায় জয় করে নেন বাঁশিপ্রেমি মানুষের হৃদয়। তিন দশক আগে ছেলে জয়ন্ত শীল ও পুত্রবধু বন্নিকা রাণী তার বাঁশি তৈরিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহায়তায় গড়ে তোলেন পারিবারিক কুটিরশিল্প। সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেন বাঁশি তৈরির কাঁচা বাঁশ। নল বাঁশে তৈরি করেন বাঁশি। এরপর চলে দেশের বিভিন্ন পথে-প্রান্তরে তার বাঁশি বিক্রির পদচারণা।
নিজ গ্রামের হাট পেরিয়ে সারাদেশেই বাঁশি বিক্রি করে বেড়ান তিনি। দেশের বিভিন্ন হাটঘাট আর শহর-বন্দরসহ স্কুল-কলেজ বা গ্রামীণমেলাসহ বিভিন্ন উৎসব বা অনুষ্ঠানে বাঁশি বিক্রি করেন এই বংশীবাদক। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বাঁশি। দৈনিক দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার বাঁশি বিক্রি করেন তিনি। জগদীশ চন্দ্র শীল বলেন, নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা বাঁশি বাজায় না, চেষ্টাও করে না। হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্প। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে একাধিক বার আবেদন করেও পাননি সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা। তার অভিযোগ যারা কুটির শিল্পের সাথে জড়িত না, তারাও সরকারের সহায়তা পায়। কিন্তু; তার পুরো পরিবার কুটির শিল্পের সাথে জড়িত থাকার পরেও সব ধরনের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দক্ষিণ আইচা মহা বিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক প্রভাষক সিরাজ মাহমুদ বলেন, বাঁশি হলো সুরের জাদু; এর সুর মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ, শূন্যতা ও ভালোবাসাকে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করে। এক সময় পথে পথে বাঁশি বাজিয়ে বাঁশের বাঁশি বিক্রির দৃশ্য ছিল স্বাভাবিক। বাঁশি বিক্রির জন্য বাঁশিওয়ালা মনোমুগ্ধকর সুর তুলে হেটে বেড়াতেন গ্রাম বাংলার হাট বাজারসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কিন্তু আধুনিকতার ছোয়ায় হারাতে বসেছে এ পেশা। জগদীশ চন্দ্র শীলসহ যারা এখনো এ পেশাটি ধরে রেখেছেন তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
